সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করায় চরম বিপাকে পড়েছেন ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালকরা। পেট্রোলের অপ্রতুলতা ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের আয় কমে গেছে আশঙ্কাজনক হারে, অন্যদিকে যাত্রীদের ভোগান্তিও বেড়েছে কয়েকগুণ।
দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অনেক সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে জামালগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেলই প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। জামালগঞ্জ–গজারিয়া বাজার, ভীমখালী, মন্নানঘাট হয়ে ধর্মপাশা, সেলিমগঞ্জ, সাচনা থেকে জেলা শহর সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল। তবে জ্বালানি সংকটের কারণে এই নির্ভরশীল ব্যবস্থাই এখন ভেঙে পড়ার মুখে।
উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের শরিফপুর গ্রামের বাসিন্দা মোটরসাইকেল চালক আরশ আলী প্রায় দুই দশক ধরে এ পেশায় যুক্ত। তিনি জানান, “মন্নানঘাট থেকে জামালগঞ্জ আসা-যাওয়া করতে কমপক্ষে ১ লিটার তেল লাগে। কিন্তু এখন চাহিদামতো তেল পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে ১৩০ টাকার পেট্রোল ২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অনেক সময় অন্য চালকদের কাছ থেকেও বেশি দামে তেল নিতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আগে বাজারে বোতলে করে পেট্রোল পাওয়া যেত, এখন সেটাও নেই। দিনে ৫০ কিলোমিটারের বেশি চালানো যায় না। গত ১৫ দিনে আয় প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ৭০০–১০০০ টাকা আয় হতো, এখন তা ১০০–৩০০ টাকায় নেমে এসেছে।”
জামালগঞ্জ উপজেলা মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতি মো. রিপন মিয়া জানান, উপজেলায় প্রায় ৫০০ চালক এই পেশার ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ চালক বর্তমানে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন জ্বালানি সংকটের কারণে।
এদিকে যাত্রীদের দুর্ভোগও চরমে পৌঁছেছে। যাত্রী মো. আব্দুর রহিম বলেন, “আগে সহজেই মোটরসাইকেল পাওয়া যেত, এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও পাওয়া যায় না। আর যা পাওয়া যায়, তাতেও দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়।”
সাচনা–সুনামগঞ্জ রুটের চালক ইয়াসির আলী জানান, “সুনামগঞ্জ পেট্রোল পাম্পে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মাত্র ২ লিটার তেল পাওয়া যায়। এতে সারাদিন চালানো সম্ভব হয় না। সবসময় ভয় থাকে, কখন রাস্তায় তেল শেষ হয়ে যাবে।”
তিনি দাবি করেন, অন্তত ৪ লিটার করে পেট্রোল সরবরাহ নিশ্চিত করা হলে চালকরা স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবেন। বর্তমানে স্ট্যান্ডে মাত্র ২০–২৫টি মোটরসাইকেল সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আব্দুল মতিন খান বলেন, “সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার করে পেট্রোল দেওয়া হচ্ছে, যাতে সবার মধ্যে সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়। তবে ভুক্তভোগীরা আবেদন করলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, বাজারে অতিরিক্ত দামে পেট্রোল বিক্রির বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।
সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই জীবিকা হারানোর শঙ্কা বাড়ছে মোটরসাইকেল চালকদের—আর অনিশ্চয়তায় পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত।