দুই হাত নেই। নিজের হাতে কলম ধরার সুযোগও নেই। অথচ থেমে যায়নি পড়াশোনা, থামেনি স্বপ্নও। দুই পায়ের আঙুলের ফাঁকে কলম চেপে ধরে লিখেছেন পরীক্ষার খাতায়, পা দিয়েই লিখে অর্জন করেছেন দাখিলের সনদ। জীবনযুদ্ধে লড়াই করে চলা জৈন্তাপুরের আশরাফ মোহাম্মদ আলী হোসেনের গল্প গণমাধ্যমে প্রকাশের পর এবার তার পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
দৈনিক নয়া দিগন্তসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আশরাফের জীবনসংগ্রাম, দারিদ্র্য ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সুনন্দা রায় নিজ হাতে এই সহায়তা প্রদান করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতেও তাকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এককালীন আর্থিক সহায়তার পর আশরাফের দীর্ঘমেয়াদি পথ কী? দুই হাত হারানো এই তরুণ কি পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো একটি স্থায়ী সুযোগ পাবেন? পরিবারের বোঝা না হয়ে বরং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার যে স্বপ্ন তিনি দেখছেন, সেটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন কী ধরনের সহায়তা—এখন সেই প্রশ্নই সামনে।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পানিছড়া গ্রামের আশরাফ মোহাম্মদ আলী হোসেনের শৈশব আর দশজন শিশুর মতোই ছিল। কিন্তু মাত্র ছয় বছর বয়সে একটি দুর্ঘটনা তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়।
২০১৪ সালে দাদির সঙ্গে কানাইঘাট উপজেলার রাজাগঞ্জ খালেরপাড় এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন আশরাফ। সেখানে দুইতলা ভবনের ছাদ থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে যাওয়ার সময় বাঁচার চেষ্টা করতে গিয়ে ১১ হাজার কেভি বৈদ্যুতিক লাইনের সংস্পর্শে আসেন তিনি।
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত আশরাফকে বাঁচাতে চিকিৎসকদের তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।
এক মুহূর্তে হারিয়ে যায় তার দুই হাত। কিন্তু হারিয়ে যায়নি বেঁচে থাকার ইচ্ছা।
দুই হাত হারানোর পর শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। জামা পরা, খাবার খাওয়া, দৈনন্দিন কাজ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। কিন্তু পড়াশোনার ক্ষেত্রে আশরাফ কারও ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চাননি।
মা আমিনা বেগমের অনুপ্রেরণায় পায়ের আঙুলের সাহায্যে কলম ধরে লেখার চেষ্টা শুরু করেন তিনি।
শুরুতে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতো। কলম ঠিকমতো ধরা যেত না। বারবার হাতছাড়া হয়ে যেত কলম। তবু থামেননি। দিনের পর দিন অনুশীলন করতে করতে প্রায় তিন বছরে পায়ে লেখার কৌশল আয়ত্ত করেন তিনি।
এরপর শ্রেণিকক্ষের খাতা থেকে পরীক্ষার উত্তরপত্র—সবখানেই তার হাতের কাজটি করতে শুরু করে দুই পা।
আশরাফ ভর্তি হন চান্দু শাহ জামেয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসায়। শিক্ষক ও সহপাঠীদের সহযোগিতা এবং নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে চালিয়ে যান পড়াশোনা।
২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় তিনি পা দিয়ে লিখে অংশ নেন। ফলাফলে জিপিএ ২.৭৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন।
বর্তমানে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
যে বয়সে অনেক তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করে, সেই বয়সেই আশরাফকে প্রতিদিন লড়তে হচ্ছে এমন সব সীমাবদ্ধতার সঙ্গে, যা অন্যদের কাছে হয়তো অকল্পনীয়।
আশরাফের মা আমিনা বেগম জানান, দুই ছেলের মধ্যে আশরাফ বড়। দুর্ঘটনার পর ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু একসময় আশরাফ নিজেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
আমিনা বেগম বলেন, বাড়িতে পায়ের আঙুলে কলম চেপে ধরে খাতায় লেখার চেষ্টা করত আশরাফ। ধীরে ধীরে পায়ে লিখতে শেখে। তার আগ্রহ ও ইচ্ছাশক্তি দেখে তাকে মাদরাসায় ভর্তি করা হয়।
তবে দৈনন্দিন জীবনে এখনো অনেক কাজেই তাকে সহযোগিতা করতে হয়। জামা-প্যান্ট পরা কিংবা খাবার মাখার মতো সাধারণ কাজও সবসময় নিজে করতে পারেন না আশরাফ।
পরিবারের আয়ের প্রধান উৎসও সীমিত। ফলে পড়াশোনা, চিকিৎসা ও সংসারের ব্যয় সামলানো তাদের জন্য কঠিন।
আশরাফ বলেন, ‘আমি হাঁটাহাঁটি ও চলাফেরা করতে পারি। কিন্তু লেখাপড়া করতে মাদরাসায় যাওয়ার সময় অনেকেই আমাকে অবহেলা করে গাড়িতে তুলতেন না। সব প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে আমি জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি অন্য সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে চাই। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। এখন আমি পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের হাল ধরতে চাই।’
আশরাফের চাওয়া খুব বেশি নয়—তিনি সহানুভূতির বদলে একটি সুযোগ চান। এমন একটি কর্মসংস্থান, যার মাধ্যমে তিনি নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারবেন।
আশরাফের পরিবারের দাবি, তার চিকিৎসা ও দীর্ঘদিনের সংসার পরিচালনার খরচ সামলাতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিক সংকটে পড়েছে। তার বাবা নিম্ন আয়ের মানুষ। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণও নিতে হয়েছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
আশরাফের মা বলেন, ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা—পড়াশোনা শেষ করার পর সে কীভাবে নিজের জীবন চালাবে।
প্রতিবেশী মুহিব উল্লাহ বলেন, দুর্ঘটনার পরও আশরাফ থেমে যায়নি। পা দিয়ে লিখে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার মতে, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে আশরাফ আরও এগিয়ে যেতে পারবে।
তিনি আশরাফের বাড়ির কাছাকাছি থাকা সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, উপযুক্ত কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে আশরাফ বাড়ি থেকে যাতায়াত করে কাজ করতে পারবে।
চিকনাগুল ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মুজিবুর রহমানও পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য সমাজের বিত্তবান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
আশরাফের জীবনসংগ্রাম ও পরিবারের আর্থিক সংকট নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি জৈন্তাপুর উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। এরপর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সুনন্দা রায় আশরাফের হাতে আর্থিক অনুদান তুলে দেন এবং ভবিষ্যতে আরও সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
প্রশাসনের এই উদ্যোগে আশরাফের পরিবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
একটি সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসনের তাৎক্ষণিক সহায়তা আশরাফের পরিবারকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু তার জীবনসংগ্রামের মূল প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে।
দুই হাত হারানো এই তরুণ পা দিয়ে লিখে দাখিল পাস করেছেন। উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু তার দৈনন্দিন জীবনে এখনো অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন এবং পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত।
তাই আশরাফের গল্পটি কেবল আর্থিক সহায়তার নয়—এটি সুযোগ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নও।
শৈশবে যে আশরাফ অন্যদের মাঠে খেলতে দেখতেন, আজ সেই আশরাফ নিজের জীবনের কঠিন ময়দানে লড়াই করে এগিয়ে চলেছেন। দুই হাত না থাকলেও নিজের পরিচয়কে তিনি প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আটকে রাখেননি।
তার সামনে এখন একটাই স্বপ্ন—পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো, পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া এবং প্রমাণ করা—সুযোগ পেলে শারীরিক সীমাবদ্ধতাও মানুষের স্বপ্নের শেষ কথা নয়।