মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

বিদেশ যাত্রা পর্ব ১

বিদেশে গিয়ে কেমন আছেন সিলেটের তরুণ প্রজন্ম?

উন্নত জীবন, উচ্চশিক্ষা এবং ভালো ভবিষ্যতের আশায় সিলেটের তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ এখন বিদেশমুখী। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা বা কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছেন তারা। কিন্তু বিদেশে গিয়ে এই তরুণরা আসলে কেমন আছেন,স্বপ্নের জীবন কি বাস্তবতায় মিলছে, নাকি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা—এ প্রশ্ন এখন অনেকের।

সিলেট ঐতিহ্যগতভাবে প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বহু বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বড় অংশই সিলেটের। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের কারণে এখানকার অনেক তরুণ ছোটবেলা থেকেই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষ করে শিক্ষার্থী ভিসায় বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।


বিদেশে যাওয়া অনেক তরুণের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হলেও বাস্তবতা সবসময় সহজ নয়। 

বিদেশে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতে হয়। এতে একদিকে যেমন নিজেদের খরচ চালাতে সুবিধা হয়, অন্যদিকে পড়াশোনা ও কাজের চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে অনেকেই শারীরিক ও মানসিক চাপে পড়েন।

এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় যাওয়া শাহপরান এলাকার বাসিন্দা মাহিন জানান- শুরুতে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাকে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। তিনি বলেন-সময় ব্যবস্থাপনা, খাবার-দাবার ও জীবনযাত্রার ধরন—সবকিছুই দেশের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় প্রথম দিকে বেশ অস্বস্তিতে ছিলাম। তবে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছি।

তিনি আরও বলেন-তবে এখানে এসে যেটা উপলব্ধি করেছি, শুধু পড়াশোনার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা অনেক কঠিন। পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করা প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়ে। নিজের খরচ চালানো, সময় ম্যানেজ করা—সবকিছুই একসঙ্গে সামলাতে হয়, যা অনেক সময় বেশ চাপের হয়ে যায়।

এ বিষয়ে আরেক শিক্ষার্থী নগরীর বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে কানাডা প্রবাসী তাসনিম তামান্না বলেন-বিদেশে আসার পর বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যাশার অনেক পার্থক্য তিনি উপলব্ধি করেছেন। তিনি জানান-এখানে সবকিছুই নিজের মতো করে সামলাতে হয়—পড়াশোনা, কাজ, এমনকি দৈনন্দিন জীবনও। শুরুতে বিষয়টি কঠিন মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলছে।

নগরীর গোয়াইপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী কাওসার আহমেদ জানান- লন্ডনে এসে বুঝেছি, এখানে জীবনযাত্রা যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। উচ্চ ব্যয়, পড়াশোনার চাপ এবং খণ্ডকালীন কাজ—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। শুরুতে বিষয়টি কঠিন মনে হলেও ধীরে ধীরে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও দায়িত্বশীল ও বাস্তববাদী করে তুলছে।

অন্যদিকে বিদেশে যাওয়ার পথে প্রতারণার ঘটনাও বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী দালাল চক্র বা ভুয়া এজেন্সির প্রলোভনে পড়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে নানা জটিলতায় পড়ছেন। কখনো ভিসা সংক্রান্ত সমস্যায় আটকে যাচ্ছেন, আবার কখনো নিম্নমানের বা ভুয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে বিপাকে পড়ছেন। এসব অনিশ্চয়তা ও প্রতারণার অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাদের শারীরিক সুস্থতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বনাথ উপজেলার বাসিন্দা এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জান্নাতুল ফেরদৌস তুলি জানান- বিদেশে এসে নিজের মতো করে জীবন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা যেমন নতুন, তেমনি চ্যালেঞ্জিংও। তিনি বলেন-আমি যখন প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে আসি, তখন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়তে ভর্তি হয়েছিলাম, সেটি আমার প্রত্যাশার তুলনায় নিম্নমানের ছিল। পড়াশোনার মান, ক্লাসের পরিবেশ এবং একাডেমিক সহায়তার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি ছিল। ফলে শুরুতে বেশ হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়েছিল।


তিনি আরও বলেন-পরবর্তীতে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। এখানে এসে শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে হয়। নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

গোলাপগঞ্জের বাঘা উপজেলার বাসিন্দা বিদেশে পড়তে যাওয়া এক শিক্ষার্থী (ছদ্মনাম) আরিফা জানান -বিদেশে গিয়ে তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভর্তির প্রক্রিয়ায় প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। তিনি বলেন- আমাকে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে সেটি সেই মানের ছিল না। ভর্তি হওয়ার পর বুঝতে পারি অনেক তথ্যই সঠিকভাবে জানানো হয়নি। এতে করে আমাকে মানসিক চাপের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও মুখোমুখি হতে হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টিআইপি হিরো অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত আল-আমিন নয়ন বলেন-বিদেশে যেতে আগ্রহী তরুণদের একটি বড় অংশ সঠিক তথ্যের অভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। তিনি বলেন-অনেকেই যাচাই-বাছাই না করে দালাল বা অননুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা তাদের জন্য বড় ধরনের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রতারণা, আর্থিক ক্ষতি এবং নানা অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়।

তিনি আরও বলেন-বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ভিসা প্রক্রিয়া এবং এজেন্সির বৈধতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তাহমিনা ইসলাম বলেন, সিলেট অঞ্চলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থী হিসেবে বিদেশে যাওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর সঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জও থাকে। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে সঠিক তথ্য জানা, প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করা এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. মো. আনিসুর রহমান বলেন-বিদেশে যাওয়ার পর অনেক তরুণ নতুন পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েন। পরিবার ও পরিচিত সামাজিক পরিবেশ থেকে দূরে থাকায় অনেক সময় একাকিত্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি দেশের খাবার-দাবারের সঙ্গে বিদেশের খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্যের কারণে অনেকের শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


তিনি বলেন-যারা পড়াশোনার জন্য বিদেশে যান তাদের অনেককেই লেখাপড়ার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতে হয়। পড়াশোনার চাপ, কাজের দায়িত্ব এবং আর্থিক উদ্বেগ—সব মিলিয়ে অনেকের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।


ডা. আনিসুর রহমান আরও বলেন-এ ধরনের পরিস্থিতিতে তরুণদের মানসিকভাবে শক্ত থাকতে পারিবারিক যোগাযোগ, সহপাঠীদের সহযোগিতা এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে অতিরিক্ত মানসিক চাপ থেকে অনেকেই গুরুতর সংকটে পড়তে পারেন।

সিলেটের তরুণদের বিদেশমুখী প্রবণতা একদিকে যেমন বৈশ্বিক সুযোগের দরজা খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। অনেক পরিবার সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করছে, এমনকি জমি বিক্রি বা ঋণ নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদেশে থাকা সিলেটের তরুণ প্রজন্ম একদিকে নতুন সম্ভাবনার সন্ধান পাচ্ছেন, অন্যদিকে নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েও পথ চলছেন। স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার এই সমন্বয়ই এখন তাদের জীবনের বড় পরীক্ষা।

এই সম্পর্কিত আরো