মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

জামালগঞ্জে হাওরে জলাবদ্ধতা, ত্রিমুখী সংকটে কৃষক

জামালগঞ্জ উপজেলা-এর বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলেও কৃষকদের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। আগাম বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নিচু জমির অধিকাংশ ধান তলিয়ে গিয়ে দেখা দিয়েছে ত্রিমুখী সংকট—প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শ্রমিক সংকট ও জ্বালানি সমস্যার চাপ। ফলে মৌসুমের শুরুতেই বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকেরা।

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, গত পনেরো দিনের টানা বৃষ্টি ও দিনে রোদ—এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে হাওরের অনেক জমিতে পানি জমে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ধান নষ্ট হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ ৪৯১ হেক্টর হলেও কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি এর চেয়েও অনেক বেশি।

পাগনার হাওর এলাকার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কাজল চন্দ্র তালুকদার জানান, জলাবদ্ধতায় অন্তত ৫০ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। যেসব জমিতে ধান টিকে আছে, সেখানেও পানি থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে, যা খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কৃষকেরা আরও জানান, বর্তমানে শ্রমিকের তীব্র সংকট রয়েছে। আগে অন্যান্য জেলা থেকে মৌসুমি শ্রমিক এলেও এখন হারভেস্টার ব্যবহারের কারণে তাদের আগমন কমে গেছে। কিন্তু জলাবদ্ধ জমিতে মেশিন ব্যবহার না করতে পারায় শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, আর এতে মজুরিও বেড়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট। অনেক হারভেস্টার মালিক পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় মেশিন চালাতে পারছেন না। ফলে ধান কাটা বিলম্বিত হচ্ছে এবং ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে।

কৃষকেরা জানান, খারাপ আবহাওয়ার পাশাপাশি শিলাবৃষ্টিও তাদের ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়েছে। অনেকেই আগাম বন্যার আশঙ্কা করছেন। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধও এখন ঝুঁকিতে রয়েছে; কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা নিরসনে বাঁধ কাটতে হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত বড় বন্যার আশঙ্কা নেই। তবে ভারী বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

অন্যদিকে কৃষকদের বড় অভিযোগ—সরকারিভাবে ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও ক্রয় কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। ফলে প্রান্তিক কৃষকেরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজনের কাছে প্রতি মণ ধান ৮০০ থেকে ৮৩০ টাকায় বিক্রি করছেন, যা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ২৪ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা জানান, জলাশয়গুলো পলিমাটিতে ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনে পাম্প ব্যবহার করা হলেও টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। কৃষকদের সহায়তায় হারভেস্টার প্রতি ১০০ লিটার জ্বালানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা নিরসনে কানাইখালী নদী খনন অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে প্রতিবছরই হাওরের ফসল একই ঝুঁকিতে পড়বে।

এ অবস্থায় কৃষকেরা দ্রুত সরকারি সহায়তা, ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এই সম্পর্কিত আরো