সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অক্সিজেন সিলিন্ডারের হিসাবের গরমিল ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধিকে ডেকে নিয়ে অবরুদ্ধ করে শাসানো ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ২৫-৩০ জনের একটি দল ওই সাংবাদিককে একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে এবং ভবিষ্যতে হাসপাতালের কোনো অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার চাপ দেয়। এ ঘটনায় স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি আমলে নিয়ে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকায় ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অক্সিজেন সিলিন্ডার সংকট ও নথিপত্রের হিসাবে গরমিল নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি প্রতিবাদমূলক পোস্ট দেয়।
অভিযোগ উঠেছে, সংবাদ প্রকাশের জেরে রোববার স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা ও ডায়াগনস্টিক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে কৌশলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেকে নেওয়া হয় দৈনিক সবুজ সিলেট-এর ধর্মপাশা প্রতিনিধি এমারুল হককে। এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সুবীর সরকারের কক্ষে নিয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করা হয়। সেখানে আগে থেকেই উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিক আহমেদ, ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, স্থানীয় বিএনপি নেতা হাদিস ও ইকবাল এবং হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মচারীসহ প্রায় ২৫-৩০ জন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অভিযুক্ত টিএইচও ডা. সুবীর সরকারের বাড়ি নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলায় হওয়ায় ওই উপজেলার কিছু লোকজনও বৈঠক চলাকালে কক্ষের বাইরে উপস্থিত ছিলেন। এর ফলে সাংবাদিক এমারুল হক চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন।
সাংবাদিক এমারুল হক অভিযোগ করেন, কক্ষে প্রবেশের পরই সংবাদ প্রকাশের কারণ জানতে চেয়ে উপস্থিত ব্যক্তিরা উচ্চবাচ্যে তাঁকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন। এ সময় টিএইচও সুবীর সরকার এবং সমাজসেবা কর্মকর্তা তৌফিক আহমেদ তাঁকে শাসিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করলে তাঁর পরিণতি ভালো হবে না। জবাবে এমারুল হক উপস্থিত সবাইকে জানান, সরেজমিনে পাওয়া বাস্তব চিত্র ও নথিপত্রের দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতেই জনস্বার্থে সংবাদটি প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে ফেসবুকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে দৈনিক সবুজ সিলেট-এর সিলেট কার্যালয় থেকে মুঠোফোনে টিএইচও ডা. সুবীর সরকারের সঙ্গে কথা বলা হয়। ফোনালাপে টিএইচও প্রথমে দাবি করেন হাসপাতালে ৩৪টি সিলিন্ডারই পুরোপুরি চালু রয়েছে এবং প্রকাশিত সংবাদ ‘মিথ্যা’।
তবে পাল্টা প্রশ্নের মুখে তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, কাগজে থাকা ৩৪টি সিলিন্ডারের মধ্যে ২টি সম্পূর্ণ নষ্ট। বাকি ৩২টির মধ্যে ২২টি খালি সিলিন্ডার গ্যাস রিফিলের জন্য ময়মনসিংহে পাঠানো হয়েছে। ফলে হাসপাতালে বাস্তবে মজুত ছিল মাত্র ১০ থেকে ১২টি সিলিন্ডার। রিফিলে থাকা ২২টি সিলিন্ডার হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সব সিলিন্ডার হাসপাতালে ‘রানিং’ রয়েছে বলে দাবি করা হলো—তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি। এছাড়া সিলিন্ডারের সঠিক তথ্য চেয়ে সাংবাদিকের দেওয়া লিখিত আবেদনেরও কোনো জবাব দেননি এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ইউএনও মহোদয়ের নির্দেশে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তবে সাংবাদিককে কেন ডেকে আনা হয়েছিল, তা আমার জানা ছিল না। আর আমার উপস্থিতিতে কোনো অবরুদ্ধ বা হুমকির ঘটনা ঘটেনি।
ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, সাংবাদিক এমরুল হক দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাকে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। আমার মা অসুস্থ থাকায় এবং আমি ছুটিতে থাকায় প্রাথমিকভাবে বিষয়টি দেখার জন্য ওসি ও সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে বৈঠকের বিষয়টি আমি জানি না। কর্মস্থলে ফিরেই জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জন মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।