সিলেটের জিন্দাবাজার কিংবা চৌহাট্টার ব্যস্ত চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভার্চুয়াল দেয়াল—সবখানেই এখন একই আলোচনা, একই কৌতূহল: ‘কারা আসছেন সিলেট ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বে?’ জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পর থেকেই নতুন কমিটির পদধ্বনি শোনা যাচ্ছিল। তবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে যেকোনো সময় এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার স্পষ্ট আভাস মিলতেই সিলেটের ছাত্র রাজনীতিতে বইতে শুরু করেছে উত্তেজনার পারদ।
সিলেটের রাজপথের চিরচেনা রাজনৈতিক আড্ডায় এখন কেবলই কমিটি গঠনের চুলচেরা বিশ্লেষণ। ফেসবুকের নিউজফিড খুললেই চোখে পড়ছে পদপ্রত্যাশী নেতাদের ব্যানার-পোস্টার ও অনুসারীদের শুভকামনার বার্তা। কে কতবার রাজপথে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হয়েছেন, বিগত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কার নামে কতটি মিথ্যা মামলা হয়েছে, আর কে কতদিন জেল খেটেছেন—নেতাকর্মীরা নিজ নিজ পছন্দের নেতার সেই ত্যাগের খতিয়ান তুলে ধরে চালাচ্ছেন জোর প্রচারণা। তৃণমূলের এই আবেগী প্রচারণায় সিলেটে ছাত্ররাজনীতির আবহ যেন অনেকটাই উৎসবমুখর, আবার ভেতরে ভেতরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
সিলেট ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিজেদের অনুকূলে নিতে পদপ্রত্যাশীদের তৎপরতা এখন আর শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিতে অনেকেই এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন, নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও বিএনপির হাইকমান্ডের নীতি-নির্ধারকদের সাথে। জেলা ও মহানগর—উভয় ইউনিটেই স্থান পেতে জোর দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন একঝাঁক তরুণ ও লড়াকু ছাত্রনেতা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নেতৃত্বের লড়াইয়ে এবং সাধারণ কর্মীদের আলোচনায় যাদের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন—আব্দুস সামাদ লষ্কর মুনিম, রুবেল ইসলাম, আজহার আলী অনিক, আবুল হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মুর্শেদ, শহীদুল ইসলাম অপু, আফজাল হোসেন, হিলাল উদ্দিন শিপু, জহিরুল ইসলাম আলাল, জয়নাল আবেদীন রাহেল, মাহবুব হোসেন, জুনেদ আহমেদ রাফি, তানবীর আহমদ খান, শিহাব উদ্দিন, আকিরুল ইসলাম জিসান, শাহান আল মাহমুদ, জাবেদুর রহমান, মাহমুদুল হাসান সাগর এবং আবু সাঈদ মো. সাকিব, আল আমিনসহ আরও কয়েকজন তরুণ মুখ।
সিলেট ছাত্রদলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাবেক ছাত্রনেতাদের প্রত্যাশা এবার স্পষ্ট। তারা কোনো নিষ্ক্রিয় নেতা কিংবা কারো পছন্দের ‘পকেট কমিটি’ দেখতে চান না। সাধারণ কর্মীদের ভাষায়, যারা দলের দুর্দিনে পিছু হটেননি, রাজপথে ব্যারিকেড গড়ে তুলেছেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে—তাদেরই শীর্ষ পদে আনা হোক। বিশেষ করে বিগত দিনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি ফ্রন্টলাইনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে মাঠপর্যায়ে হতাশা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল ও বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলা ও মহানগর ইউনিটের কমিটি গঠনের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। কোনো নির্দিষ্ট তারিখ আগে থেকে চূড়ান্ত না করা হলেও যেকোনো দিন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নেতৃত্বের নাম ঘোষণা করা হতে পারে। কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারকদের মূল লক্ষ্য—বিতর্কমুক্ত পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি (ক্লিন ইমেজ), মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিগত দিনের ত্যাগের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি উপহার দেওয়া।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক খরা আর টানাপোড়েন পেরিয়ে সিলেট ছাত্রদলে নতুন কমিটির হাত ধরে সাংগঠনিক গতিশীলতা ফিরবে—এমনটাই এখন সিলেটবাসীর ও তৃণমূলের সাধারণ কর্মীদের প্রত্যাশা। এখন দেখার বিষয়, কার কাঁধে ওঠে সিলেটের ঐতিহাসিক এই ছাত্র সংগঠনের আগামী দিনের নেতৃত্বের ভার।