বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
বিশেষ প্রতিবেদন

নেপথ্যে শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট

রাতের আঁধারে বদলে যায় পশ্চিম জাফলং সীমান্ত

প্রকৃতি ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং। তবে রাতের আঁধার নামলেই এই জনপদ বদলে যায় অন্য এক রূপে। পিয়াইন নদীর শান্ত স্রোত আর সীমান্তের নির্জনতাকে পুঁজি করে এখানে গড়ে উঠেছে চোরাচালানের এক বিশাল সাম্রাজ্য। স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও সংঘবদ্ধ চক্রের কবলে পড়ে এই সীমান্ত এলাকা এখন চোরাচালানের প্রধান করিডোরে পরিণত হয়েছে, যা জননিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পশ্চিম জাফলংয়ের পিয়াইন নদীপথ ও তৎসংলগ্ন দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলোকে পণ্য পাচারের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। ভারত থেকে অবৈধভাবে নিয়ে আসা হচ্ছে উন্নত মানের কাপড়, প্রসাধন সামগ্রী (কসমেটিকস), সিগারেট, গবাদিপশু এবং প্রাণঘাতী মাদক। এই অবৈধ পণ্যগুলো ছোট নৌকা ও স্থানীয় যানবাহনের মাধ্যমে অতি দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো সীমান্ত এলাকার লাইন নিয়ন্ত্রণ করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এই চক্রের অধীনে কাজ করছে স্থানীয় দালাল, পরিবহন চালক এবং কিছু কথিত প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কিছু পণ্য ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।

অভিযোগ রয়েছে পুলিশ, বিজিবিও ডিবির লাইনম্যান পরিচয়ে তোলা হয় লক্ষ লক্ষ টাকা। কতিত এসব লাইনম্যানরা সবসময়ই তাকে প্রশাসনের ধরা ছোয়ার বাহিরে যার ফলে এ রুটে চোরাচালান যেন অপ্রতিরোধ্য। 

সীমান্ত এলাকায় শিল্প-কারখানা বা কর্মসংস্থানের অভাবকে এই অপরাধের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। জীবিকার তাগিদে সীমান্তবর্তী গ্রামের অনেক বেকার যুবক ও শিক্ষার্থী লোভে পড়ে জড়িয়ে পড়ছে চোরাচালানে। এই ‘অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি’ এলাকার তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার ফলে মাদক ও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।

চোরাচালানকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে সীমান্ত এলাকায় বেশ কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চোরাকারবারিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয়দের মতে, সীমান্ত এলাকাটি এখন এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

চোরাচালানের সমান্তরালে পিয়াইন নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনও অব্যাহত রয়েছে। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অঞ্চল শুধু অপরাধের স্বর্গরাজ্যই নয়, বরং প্রাকৃতিক বিপর্যয়েরও সম্মুখীন হবে।

সীমান্তের ভৌগোলিক জটিলতা ও দুর্গম পাহাড়ি পথের কারণে নজরদারি করা চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে চাইলে পশ্চিম জাফলংয়ের বিট কর্মকর্তা এসআই তানজিল আহমদ চোরাচালানের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চোরাচালান এদিকে হয় না।

এদিকে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বর্তমান এসপি মহোদয়ের নির্দেশে কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন।

 

তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের দাবি, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নজরদারি (যেমন- ড্রোন ও সিসিটিভি) এবং সীমান্ত এলাকার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলে এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

পশ্চিম জাফলং সীমান্ত এখন শুধু অপরাধের রুট নয়, বরং এক সামাজিক বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছে গোয়াইনঘাটের সাধারণ মানুষ।

এই সম্পর্কিত আরো