সিলেটের পর্যটন ও সীমান্ত জনপদ জৈন্তাপুর। একদিকে পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির মায়াবী হাতছানি, অন্যদিকে তামাবিল মহাসড়ক ধরে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রবাহ। তবে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই সীমান্ত উপজেলায় আইনশৃঙ্খলার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন তো আসেইনি, বরং অভিযোগ উঠেছে—পুরো থানাকে যেন একটি অর্থ উপার্জনের ‘ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক কেন্দ্রে’ রূপান্তর করেছেন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা।
মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে চাঁদাবাজি, সীমান্ত চোরাচালানে প্রকাশ্য মদদ, কোটি টাকার জব্দ তালিকা থেকে মাল গায়েব এবং সুকৌশলে রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে অর্থ লুটের এক এলাহী কারবার গড়ে তুলেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। নিজেকে কুমিল্লার একজন এমপির (সংসদ সদস্য) ভাগনে পরিচয় দেওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা জৈন্তাপুর থানায় যোগদানের পর থেকেই একের পর এক বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিহ্নিত চোরাকারবারিদের সাথে তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়ায় সীমান্তজুড়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। আর এসব অপকর্ম আড়াল করতে তিনি বেছে নিয়েছেন চতুর এক কৌশল-সব দোষ তৃণমূল বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের অপচেষ্টা।
সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের হরিপুর চেকপোস্ট যেন এখন গাড়ি থামিয়ে প্রকাশ্য টাকা তোলার ‘টোল প্লাজা’। তবে এই টোল সরকারের কোষাগারে যায় না, যায় থানার ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লার তৈরি সিন্ডিকেটের পকেটে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চালকদের তথ্যমতে, আগে চেকপোস্টে প্রতি গাড়ি থেকে ১ হাজার টাকা নেওয়া হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই রেট বেড়ে ঠেকেছে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকায়। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, পুলিশ সদস্যরা গাড়ি আটকে নিয়মিত চাঁদার বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে বলে, ‘এটা বিএনপির টাকা।’ কোনো চালক অপারগতা প্রকাশ করলে খোদ পুলিশ সদস্যরা যুবদল ও ছাত্রদলের নামধারী বিতর্কিত কিছু ব্যক্তির সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলে।
৩০ অক্টোবর রাতে হেমু বেলপাড়া গ্রামের পণ্যবাহী গাড়ির চালক সালেহ সেই অন্যায্য চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে পুলিশ ও তাদের পোষ্য ক্যাডার বাহিনী চালকসহ দুজনকে সড়কে বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হলে ফাঁস হয়ে পড়ে চেকপোস্টের নেপথ্য খেলা।
ঘটনার পর তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীরা যখন ক্ষোভে ফেটে পড়েন, তখন চেকপোস্টে দায়িত্বরত উপ-পরিদর্শক এএসআই শামীম আহমদকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের সামনে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের তোপের মুখে ওই পুলিশ কর্মকর্তা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন—তিনি কেবল আদেশের বাস্তবায়নকারী মাত্র। সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে তিনি জানান, গাড়িপ্রতি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত এবং নিয়মিত এই অর্থ তোলার পুরো নির্দেশনা আসে স্বয়ং ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লার টেবিল থেকেই।
কিন্তু পরের দিন ১ নভেম্বর যখন বিএনপি নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একটি প্রতিনিধি দল থানায় গিয়ে ওসির কাছে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান, তখন ওসি পুরো বিষয়টি অবলীলায় অস্বীকার করেন। উল্টো সেই চাঁদাবাজি বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে তিনি সিন্ডিকেটকে মাঠে বহাল তবিয়তে রাখেন।
সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত এখন আর কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি যেন অবৈধ বাণিজ্যের এক অভয়ারণ্য। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির তোয়াক্কা না করে এখানে দিন-রাত সমানতালে চলছে ভারতীয় গরু-মহিষ, চিনি, জিরা, কসমেটিকস ও মাদকের অবাধ প্রবেশ।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, জৈন্তাপুর সীমান্তের প্রতিটি সংবেদনশীল পয়েন্টে সক্রিয় রয়েছে একটি শক্তিশালী ‘লাইনম্যান’ চক্র। এই চক্রটি মূলত চোরাচালানের নিরাপদ করিডোর হিসেবে কাজ করে। প্রতিটি চালান নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নামে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, এই অবৈধ অর্থের বড় একটি অংশ পৌঁছায় ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লার কাছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত মাসোহারা না দিলে সীমান্ত পথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় চোরাকারবারিদের।
জৈন্তাপুর থানার বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ কেবল চেকপোস্টের চাঁদাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়; ওসির বিরুদ্ধে উঠেছে রাষ্ট্রীয় মাল আত্মসাতের গুরুতর সব তথ্য।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি সারিঘাট এলাকায় একটি ট্রাকভর্তি ভারতীয় শাড়ির বড় চালান আটক করে পুলিশ। কিন্তু সেই চালানের পুরো মালামাল জব্দ তালিকায় না দেখিয়ে অর্ধেকের বেশি—যার বাজারমূল্য প্রায় কোটি টাকার ওপরে—কৌশলে গায়েব করে দেওয়া হয়। স্থানীয় কিছু লাইনম্যান ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ে সেই মালামাল ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগ রয়েছে ওসির বিরুদ্ধে। একইভাবে ‘ভয়ংকর এক্সপ্রেস’ লেখা একটি ট্রাকভর্তি বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মদের চালান উদ্ধার করা হলেও তার অর্ধেক চালান রহস্যজনকভাবে ওসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সরিয়ে ফেলা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে অবাধে ভারতীয় গরু-মহিষের অনুপ্রবেশ, নদী থেকে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন এবং এমনকি ৫ আগস্টের পর চিহ্নিত আসামিদের অর্থের বিনিময়ে সীমান্ত পারাপারের (পুশ-ইন/আউট) সিন্ডিকেটেও এই পুলিশ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার গুঞ্জন এখন জৈন্তাপুরের চা-দোকান থেকে প্রশাসনের অন্দরমহল পর্যন্ত বিস্তৃত।
পুলিশ নিজেদের পকেট ভারী করতে বিএনপির নাম ব্যবহার করছে—এমন তথ্যে ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো। দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের স্পষ্ট কথা: স্বৈরাচারের দোসর ও হাইব্রিড চক্রকে সঙ্গে নিয়ে ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লা চাঁদাবাজির রামরাজত্ব গড়েছেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে বিএনপির ভাবমূর্তি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন।
সোমবার ৫ নম্বর ফতেহপুর ইউনিয়ন বিএনপির জরুরি বৈঠক থেকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে—দলের নাম ভাঙিয়ে পুলিশের এই চাঁদাবাজি আর মেনে নেওয়া হবে না। হরিপুর ইউনিয়ন ও উপজেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দলের কেউ জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কিন্তু ওসির এই পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রাজপথেই মোকাবিলা করা হবে। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার ইউনিয়ন কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল ‘গণজমায়েত’ ও জনতার কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
এসব গুরুতর অভিযোগ নিয়ে যখন সংবাদকর্মীরা ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়ার পরিবর্তে তিনি উল্টো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘আপনি কথা রেকর্ড করছেন কেন? আমি বক্তব্য দিব না। হরিপুর চেকপোস্টে কি আমি ডিউটি করি?’—এমন কথা বলে তিনি ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে বলেন, আপনি আমার বিরুদ্ধে আগেও নিউজ করেছেন, আমার সামনে এসপি আছেন? আপনি তো সাংবাদিক, আমি সরকারি কর্মকর্তা। আপনি এভাবে ফোন দিতে পারেন না।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে প্রতিবেদকের কাছে তদবির করিয়েছেন ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লা।
এদিকে সিলেট জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে মন্তব্য না করে সরাসরি অফিসে গিয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন।
একজন সরকারি পোশাকধারী কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় পুরো একটি উপজেলার নিরাপত্তা ও সীমান্ত বাণিজ্য এভাবে জিম্মি হয়ে পড়বে-তা কখনো কাম্য হতে পারে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুফল যখন সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করছে, তখন জৈন্তাপুরে ওসি মাহবুবুর রহমান মোল্লার এই ‘একনায়কতন্ত্র’ ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট স্থানীয় প্রশাসনকে চরম আস্থার সংকটে ফেলে দিয়েছে। ওসির এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অবসান না হলে সীমান্তবর্তী এই শান্ত জনপদে যে বড় ধরনের গণবিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে, স্থানীয়দের ক্ষোভ তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।