সিলেটের পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত জৈন্তাপুর। লালাখাল, ডিবিছ হাওরের শাপলা বিল আর সারিপা-জৈন্তা পাহাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন হাজারো মানুষ। কিন্তু এই অপরূপ সৌন্দর্যের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়। রাতের আঁধার নামতেই এখানকার শান্ত সীমান্ত রূপ নেয় চোরাচালানের এক উত্তাল অভয়ারণ্যে। পাহাড়ে ঘেরা এই জনপদ এখন চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের চারণভূমি, যেখানে প্রতি রাতে গড়ে কোটি কোটি টাকার ওপার থেকে আসা পণ্য, আর তার হাত ধরেই সীমান্তজুড়ে ডালপালা মেলছে অপরাধের নতুন নতুন সাম্রাজ্য।
দিনের আলোয় যা শান্ত-স্নিগ্ধ, রাতের আঁধারে তা-ই হয়ে ওঠে চোরাকারবারিদের অঘোষিত স্বর্গরাজ্য। স্থানীয়দের তথ্যমতে, জৈন্তাপুরের সীমান্তজুড়ে প্রায় ২৫টিরও বেশি সক্রিয় পয়েন্ট রয়েছে। ১২৭৮ বালিয়া হাওর, শান্তিপুর গ্রাম, শ্রীপুর, মিনাটিলা, রমার বাগান কিংবা ডিবিছ হাওর—প্রতিটি স্পটই যেন চোরাই পণ্যের একেকটি প্রবেশদ্বার। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রুটগুলো দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকতে থাকে ভারতীয় চিনি, জিরা, কসমেটিকস, শাড়ি, লেহেঙ্গা কিংবা সুপারি। শুধু তা-ই নয়, জীবন রক্ষাকারী নামীদামি ওষুধ থেকে শুরু করে মাদক ও ভারতীয় গরু-মহিষের বিশাল বিশাল চালানও প্রবেশ করছে বিনা বাধায়। কখনও গাছগাছালির পথ ঘেঁষে, আবার কখনও সাঁতার কেটে নদী পার করে ভাসিয়ে আনা হচ্ছে কোটি কোটি টাকার পণ্য।
চোরাচালানের এই বিশাল চেইন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি চলে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। স্থানীয় ভাষায় এদের বলা হয় ‘লাইন বাহিনী’। রাজনৈতিক ছত্রছায়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই বাহিনীর সদস্যরা তা নিয়ন্ত্রণ করে। প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সাথে অনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এরা তৈরি করেছে এক দুর্ভেদ্য নেটওয়ার্ক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে চোরাকারবারিদের কৌশলেরও কোনো শেষ নেই। ছোট চালানগুলো অনায়াসে ঢুকে পড়ে যাত্রীবাহী ছোট ছোট লেগুনা বা সিএনজিতে। আর বড় চালানগুলো পাচার করা হয় পাথর কিংবা বালুবাহী ট্রাকের ভেতরে লুকিয়ে। সীমান্ত ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বড় বড় গোপন আস্তানা ও বাঙ্কারজাতীয় জায়গা, যেখানে রাতের আঁধারে ট্রাক খালাস করা হয় আর ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই পণ্য ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের বাজারে। এমনকি অবৈধ উপায়ে আসা ভারতীয় গরু-মহিষকে স্থানীয় জৈন্তাপুর হাটের মাধ্যমে রাতারাতি ‘বৈধ’ করার অপচেষ্টাও চলে প্রকাশ্যে।
চোরাচালানের এই মহোৎসব রুখতে সীমান্ত ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের গত এক মাসের সম্মিলিত অভিযানে দৃশ্যত চোরাই সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বিজিবির সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) গত এক মাসে সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখিয়েছে। শুধু গত ৯ সেপ্টেম্বর বিশেষ অভিযানেই তামাবিল, বাংলাবাজার ও সোনারহাট সীমান্ত থেকে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৯৮ হাজার ২১০ টাকার পণ্য জব্দ করা হয়েছে। পুরো আগস্ট মাসজুড়ে জৈন্তাপুর সীমান্তে বিজিবির ধারাবাহিক অভিযানে উদ্ধার হয়েছে আরও প্রায় ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকার ভারতীয় চিনি, জিরা, শাড়ি, কসমেটিকস ও মহিষ।
র্যাব-৯ এর বিশেষ টিম গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট সংযোগকারী মহাসড়কে একাধিক বড় চালান সংক্রান্ত অভিযান চালায়। গত ১ মাসে র্যাব ও বিজিবির যৌথ ও একক অভিযানে প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা মূল্যের ভারতীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, প্রসাধন ও বিলাসবহুল গাড়ির চালান আটক করা হয়েছে।
জৈন্তাপুর মডেল থানা পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ১ মাসে উপজেলার অভ্যন্তরীণ রুট এবং হরিপুর বাজার সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চিনি ও মাদকবাহী ৫টি পিকআপ এবং ৩টি ড্রাম ট্রাক জব্দ করেছে। এসব অভিযানে জব্দকৃত মালামাল ও যানবাহনের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
চোরাচালানের এই রমরমা বাণিজ্যে প্রতিদিন উড়ছে লাখ লাখ টাকা। আর এই টাকার ভাগাভাগি এবং সীমান্তে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিষিয়ে উঠছে স্থানীয় সামাজিক পরিবেশ। এই বিপুল অর্থের লোভ রূপ নিচ্ছে চরম সহিংসতায়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখের নিজপাট ইউনিয়নের পৈলপুলে গ্রামের ঘটনা। ভারত থেকে আসা চোরাই চালানের টাকার ভাগাভাগি ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বর্তমান ও সাবেক দুই ইউপি সদস্যের সমর্থকদের মধ্যে টানা দুই দিনব্যাপী চরম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এক পক্ষ অন্যপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে, আহত হলেন অন্তত ২৫ জন। যে এলাকার মানুষ একসময় শান্তিতে বসবাস করতেন, সেখানে এখন বিরাজ করছে এক থমথমে আতঙ্ক।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সীমান্তের এই বেপরোয়া চোরাচালান কেবল দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং স্থানীয় তরুণ সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে। অল্প পরিশ্রমে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আশায় সীমান্তের অনেক যুবক পড়াশোনা ও স্বাভাবিক কর্মসংস্থান ছেড়ে জড়িয়ে পড়ছেন এই মরণনেশায়। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছে, কোটি কোটি টাকার মালামাল জব্দ করছে এবং চোরাচালানের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করছে। কিন্তু কেবল অভিযান চালিয়ে এই ব্যাধি দূর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোদ স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের দাবি, যতক্ষণ না এই চোরাচালানের পেছনের মূল হোতা ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা যাবে, ততক্ষণ জৈন্তাপুরের এই শান্ত পাহাড়ি জনপদে শান্তি ফিরবে না। প্রকৃতির অপরূপ চাদরে ঢাকা জৈন্তাপুর চোরাচালানের এই ঘোড়াব্যাধি থেকে কবে মুক্ত হবে—এখন সেটাই সীমান্তবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।