কোম্পানীগঞ্জে কোটি টাকার বালু হরিলুটে মাফিয়াদের বেপরোয়া রাজত্বে সমতল কৃষিজমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে এখন ভোলাগঞ্জ মহাসড়ক ও পার্শ্ববর্তী জনপদ মারাত্মক ধ্বংসের মুখে পড়েছে। উপজেলার তিনতলা ও সেবা পাম্প সংলগ্ন সবুজ ফসলি জমিতে রাতের আঁধারে ড্রেজার বসিয়ে বালু লুটে নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। দিনের পর দিন অবৈধ এই উত্তোলনের ফলে পুরো এলাকা এখন বিশালাকার মৃত্যুফাঁদ ও জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
মাস দুয়েক বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি আবারও রাতের আঁধারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই অবৈধ চক্রটি। ভূমি মালিক একপক্ষের অভিযোগ, গত মাত্র এক সপ্তাহেই প্রায় ১৫ লাখ টাকার বালু লুট করা হয়েছে। বাধা দিতে গেলে তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে প্রাণনাশের হুমকি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অতীতে কথিত ভূমি মালিক, ড্রেজার মালিক ও পুলিশের ত্রিভুজ যোগসাজশের অভিযোগ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের সম্পৃক্ততা নেই বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয় যুবলীগ কর্মী ডাকঘর গ্রামের কাদির, পাড়ুয়া উজান পাড়ার জসীম, সেলিম ও কালাচরণসহ একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। অভিযুক্ত কাদির ও জসীম জোরপূর্বক লুটের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তারা ভূমি মালিকদের কাছ থেকে ট্রাক্টর প্রতি ২,০০০ টাকা দরে বালু কিনে ব্যবসা করছেন মাত্র।
অন্যদিকে, রসিক মিয়া, আঙ্গুর মিয়া, আশিক মিয়া ও হোসেল মিয়া নামের কয়েকজন ভূমি মালিকের বিরুদ্ধেও প্রতি রাতে কয়েক লাখ টাকার বালু বিক্রির তথ্য দাবি করা হচ্ছে স্থানীয় যুবক কাদিরের দেওয়া হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও ক্লিপে। ভিডিওচিত্রে রসিক মিয়া ও আশিক মিয়াকে টাকা গুনতে দেখা গেছে। তবে রসিক মিয়া এই লেনদেনকে "সাইট ভাড়া" দাবি করে বলেন, একটি প্রভাবশালী চক্র তাদের জমিতে বাধা সৃষ্টি করতে প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে এবং তিনি নিরাপত্তার স্বার্থে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে আরেক ভূমি মালিক আঙ্গুর মিয়া বিগত দিনে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে দেখা গেছে, এখানে কোনো চাঁদাবাজি নয়, বরং মিলেমিশে বালু তোলা হতো; তবে কৃষিজমি হওয়ায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এটি বন্ধ হওয়া জরুরি।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নজরে বিষয়টিকে আনা হলে নড়েচড়ে বসে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন। ১৪ আগস্ট (শুক্রবার) রাতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিন মিয়ার নেতৃত্বে এবং কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি ওসমান গনি ও ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই জগৎ জ্যোতির সহায়তায় এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানকালে অবৈধ বালু তোলায় ব্যবহৃত ৩টি ড্রেজার মেশিনে আগুন ধরিয়ে ধ্বংস করা হয় এবং প্রায় ৫৫০ ফুট পাইপ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় প্রশাসন। সেই সাথে উত্তোলিত বালু নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
ইউএনও মোহাম্মদ রবিন মিয়া জানান, অভিযানের বার্তা পেয়ে দুষ্কৃতকারীরা সটকে পড়ায় তাৎক্ষণিক কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। তবে দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নবনিযুক্ত ওসি ওসমান গনি জানান, মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশি টহল জোরদার করা হয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না স্থানীয়রা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবনেতা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, "কোনো নদী-নালা না থাকা সত্ত্বেও সমতল ভূমিকে গর্ত করে জলাশয় বানানো হয়েছে। পানির তোড়ে কখন যে আশপাশের ঘরবাড়ি বিলীন হয় বলা কঠিন।"
এক প্রবীণ বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "এখন আর অভিযান দিয়ে কী হবে? যা ধ্বংস হওয়ার তা তো টাকার বিনিময়ে বিল-বাদাড় হয়েই গেছে!"
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি শওকত আলী বাবুল এবং সাবেক সভাপতি ও সেবা পেট্রোল পাম্পের মালিক হাজী শাহাব উদ্দিন জানান, মহাসড়ক ও বসতবাড়ির পাশে এভাবে সমতল জমি ধ্বংসের বিষয়টি ইতোমধ্যে মন্ত্রী মহোদয়ের গোচরে আনা হয়েছে। পরিবেশ ও জনপদ বাঁচাতে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।