সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি সীমান্ত এলাকায় এক আতঙ্কের নাম নুরুজ্জামান নুরু ওরফে ‘ট্যাক্টর নুরু’। মাত্র চার বছর আগে যিনি ছিলেন সাধারণ এক ট্রাক্টর চালক, আজ তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। অভিযোগ রয়েছে, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তাদের ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে সীমান্তজুড়ে গড়ে তুলেছেন এক বিশাল চোরাচালান সাম্রাজ্য। ভারতীয় চিনি, মাদক ও কসমেটিকস চোরাচালানে তিনি এখন অঘোষিত সম্রাট।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নুরু একসময় ট্রাক্টর চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু গত দুই বছরে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে অবিশ্বাস্য গতিতে। সিলেট জেলা ডিবি পুলিশের সাবেক বিতর্কিত ওসি ইকবাল হোসেন এবং সাবেক ওসি রেফায়েতের ‘লাইনম্যান’ হিসেবে কাজ শুরু করার পর থেকেই তার উত্থান। বর্তমানে ডিবি পুলিশের নাম ব্যবহার করে তিনি সীমান্ত এলাকায় চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের লাইন নিয়ন্ত্রণ করেন। তার এই হঠাৎ বিত্তশালী হওয়া দেখে হতবাক বিছনাকান্দির সাধারণ বাসিন্দারা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ৬ জুন সিলেটের জালালাবাদ থানার উমাইরগাঁওয়ে ১৪ ট্রাক ভারতীয় চোরাই চিনি জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ট্রাকচালক মুনসুর আলী এবং সদরুল আমিন আকাশ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—ওই চিনির ট্রাকগুলো ভাড়া করেছিলেন স্বয়ং নুরুজ্জামান নুরু। এমনকি জব্দ হওয়া ১৪টি ট্রাকের মধ্যে একটি ট্রাকের মালিকও এই নুরু। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক ‘ম্যানেজ’ এর দক্ষতায় তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নুরুজ্জামান নুরু সিলেট জেলা পরিষদের সংরক্ষিত সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেত্রী হেনা বেগমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। মূলত এই রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই তিনি বিছনাকান্দি সীমান্ত এলাকা দাপিয়ে বেড়ান। অভিযোগ আছে, স্থানীয় প্রশাসন, প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি এবং কতিপয় সাংবাদিককে অনৈতিকভাবে ‘ম্যানেজ’ করেই চলছে তার এই অবৈধ কারবার।
সম্প্রতি ৮ আগস্ট মুন্সিবাজার এলাকায় নুরুর ২২ লাখ টাকার চোরাই পণ্যবাহী দুটি নৌকা ডাকাত দলের কবলে পড়ে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে ডাকাতদের কাছ থেকে ওই পণ্য ফেরত আনেন নুরু। এই ঘটনাটি এলাকায় তার ক্ষমতার দাপট ও চোরাচালানে তার গভীর আধিপত্যের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নুরুজ্জামান নুরু নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তিনি চোরাচালান বা ডিবির লাইনম্যান পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে প্রতিবেদক যখন তাকে প্রশ্ন করেন—মাত্র ৪ বছর আগেও তিনি ট্রাক্টর চালক ছিলেন কি না এবং কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন? এই প্রশ্ন করা মাত্রই তিনি কথা না বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
বিছনাকান্দি সীমান্তের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের প্রশ্ন—একজন সাবেক ট্রাক্টর চালক কীভাবে প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে এমন বিশাল চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে দিনের পর দিন তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন? সীমান্ত অপরাধ দমনে নুরুর মতো মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা ডিবির ওসি আলী আশরাফের সাথে যোগাযোগ মুঠোফোনে করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল জানান, চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে গোয়াইনঘাট থানা সবসময় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে আছে।