সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র ‘সচিব’ পদটি বর্তমানে এক চরম বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সচিব চৌধুরী মামুন আকবরের বিরুদ্ধে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার, নজিরবিহীন আর্থিক দুর্নীতি এবং দাপ্তরিক নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পদায়ন পাওয়া এই কর্মকর্তার কারণে বোর্ডের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বোর্ডের ‘সচিব’ পদটি বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের অধ্যাপক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত থাকলেও চৌধুরী মামুন আকবর মূলত একটি জাতীয়করণকৃত কলেজের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুস শহীদের সরাসরি সুপারিশে তিনি এই পদটি বাগিয়ে নেন। তাঁরা উভয়েই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এবং পরস্পরের নিকটাত্মীয় বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মামুন আকবর আত্মগোপনে চলে যান এবং তাঁকে মৌলভীবাজার সরকারি মহিলা কলেজে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, কোনো যোগদানপত্র ছাড়াই তিনি পুনরায় সচিবের চেয়ারে আসীন হয়েছেন। যদিও বর্তমানে তিনি স্বপদে দায়িত্ব পালন করছেন, কিন্তু তাঁর বর্তমান যোগদানের সপক্ষে কোনো লিখিত কাগজপত্র বা যোগদানপত্র দপ্তরে পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
বোর্ডের অর্থ ব্যয় নিয়ে উঠেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপনকে কেন্দ্র করে বরাদ্দকৃত অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া, আম্বরখানা প্রাইম ব্যাংকে কর্মরত তাঁর স্ত্রী নাজিয়া ইয়াসমীনকে অনৈতিক সুবিধা দিতে তৎকালীন বোর্ড চেয়ারম্যান রমা বিজয় সরকারকে ব্লাকমেইল করে বোর্ডের ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ওই ব্যাংকে স্থানান্তর করার তথ্য পাওয়া গেছে। এমনকি প্রশ্নপত্র ছাপানোর কাজে ঢাকা ভ্রমণে মাত্র একদিন অবস্থান করেও ১৪ দিনের বিল বাবদ ৯৫ হাজার টাকা উত্তোলনের মতো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
চৌধুরী মামুন আকবরের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক কাজে চরম গাফিলতি ও নারী সহকর্মীদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তিনি নিয়মিত অফিস না করে এবং বোর্ড চেয়ারম্যানের এখতিয়ারকে তোয়াক্কা না করে ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’ প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রশাসনিক অদক্ষতা ও কর্তব্যে গুরুতর অবহেলা দেখিয়েছেন।
অভিযুক্ত সিলেট শিক্ষাবোর্ডের সচিব প্রফেসর চৌধুরী মামুন আকবর ‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’ প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে বলেন, ‘এটি অটো সিস্টেমের (স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি) মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে এটি আমার ভুল নয়, এটি ক্লার্কের ভুল।’ যোগদানপত্রের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যোগদানপত্রের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে।’ ম্যুরাল নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি জানান, এটি তিনি যাওয়ার আগেই নির্মিত হয়েছে। সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা একই উপজেলার মানুষ, তবে তাঁর সাথে আমার কোনো পারিবারিক বা বিশেষ সম্পর্ক নেই।’ এছাড়া অন্যান্য সব অভিযোগ তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
সাবেক সচিব মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে মামুন আকবর আসার পর তিনি আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছেন। পুরো আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি সরকারের সক্রিয় সমর্থক হিসেবে কাজ করেছেন। সরকারের যাবতীয় রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আওয়ামী লীগের সময়ে যে সমস্ত প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, সবগুলো পদায়নই ছিল সরকারের প্রতি তাঁর নিঃশর্ত ও অন্ধ আনুগত্যের পুরস্কার। ২০১২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত তাঁর সমস্ত পদায়নই আওয়ামী লীগের আমলে হয়েছে। একজন নন-বিসিএস (আত্তীকৃত) কর্মকর্তা হয়েও তিনি তাঁর চেয়ে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন বিসিএস উত্তীর্ণ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে রাজনৈতিক মদদপুষ্ট হয়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তিনি পূর্বের রাজনৈতিক পরিচয় বিভিন্নভাবে গোপন রাখেন।’
বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, ‘সচিবের যোগদানের কপি রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আদেশ করা হয়েছে। ম্যুরালের বিষয়ে আমি জানি না, কারণ সে সময় আমি এখানে দায়িত্বরত ছিলাম না।’ এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নারী সহকর্মীদের সাথে আপত্তিকর মন্তব্যের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না উল্লেখ করে বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি; অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
‘রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে’ প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি মূলত একটি অফিস আদেশ ছিল। তবে এখানে তাঁর (সচিবের) অবশ্যই দোষ আছে, তাঁর উচিত ছিল বিষয়টি দেখে স্বাক্ষর করা। এটি তাঁর ভুল হয়েছে। যেহেতু পদটি দায়িত্বপূর্ণ, তাই এই ব্যাপারে তাঁর এমন গাফিলতি ঠিক হয়নি।’
সাবেক চেয়ারম্যান রামা বিজয় সরকার প্রাইম ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি ব্যাংক ছাড়া বোর্ডের টাকা হস্তান্তর করা যায় না তবে হয়তো কিছু টাকা রাখা হয়েছে।’
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও দ্রুত কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।