সিলেটের রায়নগরে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের (তিন খুন) ঘটনায় চরম উত্তেজনা ও নতুন মোড় সৃষ্টি হয়েছে। রিকাবীবাজারের কোটি টাকার জমিসংক্রান্ত বিরোধ ও পূর্বপরিকল্পিত হুমকির জেরে ‘ভাড়াটে খুনি’ দিয়ে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নিহত দম্পতির পরিবার। এ ঘটনায় নিহত দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা বাদী হয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
তবে পুলিশ এ ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের এক রংমিস্ত্রিকে গ্রেপ্তার করলেও দায়ের করা মামলার এজাহারে তার নাম নেই। নিহত পরিবারের দাবি, বাবুল একা এই তিন খুনের ঘটনা ঘটাতে পারে না; এর পেছনে প্রভাবশালী বড় কোনো হাত রয়েছে এবং মূল ঘটনা ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরানোর চেষ্টা চলছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, নিহত এম এ সাত্তার ১৯৯৭ সালে সিলেট পুলিশ লাইন্স লুসাই গির্জা সমিতির কাছ থেকে রিকাবীবাজারের শরফপুর এলাকায় প্রায় ১২ শতক জমি ইজারা নিয়ে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ইম্পালস বিজনেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম উক্ত জমিসহ সমিতির অন্যান্য জমি নিজের প্রতিষ্ঠানের নামে দলিল করে মালিকানা দাবি করেন এবং সাত্তারের পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি দেন।
এই বিরোধের জেরে ২০১৬ সালে এম এ সাত্তার আদালতে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য সিরাজুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়েছিল। এজাহারে আরও বলা হয়, সর্বশেষ চলতি বছরের গত ২৮ ও ৩০ জুলাই আদালত প্রাঙ্গণেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এসব হুমকির ধারাবাহিকতাতেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে বৃদ্ধ দম্পতি ও গৃহপরিচারিকাকে খুন করা হয়েছে এবং বাসা থেকে জমিসংক্রান্ত মূল কাগজপত্র ও জিডির কপি লুটে নেওয়া হয়েছে।
মামলা দায়েরের পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে মেয়ে সেলিনা সুলতানা বলেন, “আমি আর আমার ভাই আসছি। আমাদের মা-বাবা যেভাবে খুন হয়েছেন, আর যেন কোনো মা-বাবার ক্ষেত্রে এমন না ঘটে। ছেলের কাঁধে যেন মা-বাবার লাশ আর না ওঠে।”
গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সাথে অভিযুক্তের সম্পর্কের গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “কাজের মেয়েটাকে বাঁচাতে গিয়েই আমার মা খুন হয়েছেন। বাচ্চা মেয়েটার কোনো ফোন ছিল না, ও আমাদের কাছে আমানত ছিল। মূল কেসটা ঘোরানোর জন্যই মেয়েটাকে সামনে আনা হচ্ছে, যা একদম অসত্য। আর বাবুল নামের এই লোক একা তিনটি মার্ডার করতে পারে না, এর পেছনে অবশ্যই বড় কোনো হাত আছে।”
নিহত এম এ সাত্তারের ছেলে আরিফ ইফতেখার জানান, তারা পুলিশের সুষ্ঠু তদন্ত ও আসামির রিমান্ডের জন্য অপেক্ষা করছেন।
এর আগে গত ১২ আগস্ট (বুধবার) সকালে রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে এম এ সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং তাদের গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)-এর রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন বিকেলে রাজবাড়ী এলাকা থেকে বাবুল মিয়া (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি ছিল—রংমিস্ত্রির কাজ করার সূত্রে গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সাথে বাবুলের পরিচয় ছিল এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। গত ১৩ আগস্ট তাকে ৫৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মঈনুল জাকির জানান, “মেয়ে সেলিনা সুলতানার দায়ের করা মামলাটি রেকর্ড করা হয়েছে। বাদীপক্ষ এজাহারে জমিসংক্রান্ত পূর্ববিরোধের কথা উল্লেখ করেছেন। আমাদের প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে একজনকে আটক করে ৫৪ ধারায় চালান দেওয়া হয়েছিল, তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর (শো-অ্যারেস্ট) আবেদন করা হবে।”
তিনি আরও জানান, আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সঠিক কারণ বের হয়ে আসবে। বাদীপক্ষের তোলা অভিযোগসহ ঘটনার সাথে জড়িত সম্ভাব্য প্রতিটি দিকই গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।