সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকা এখন মানবপাচারকারী ও চোরাচালান চক্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে উঠে এসেছে আব্দুল করিম ওরফে বেন্ডিস করিমের নাম। সীমান্ত দিয়ে অবাধে নারী ও শিশু পাচার এবং ভারত থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন এই বেন্ডিস করিম। সম্প্রতি জৈন্তাপুরে তার তিনতলা বাড়িতে পুলিশি অভিযান এবং নাটকীয়ভাবে পাচারকারী গ্রেপ্তারের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে রোমহর্ষক সব তথ্য। কেবল মানুষ নয়, তার বিরুদ্ধে ভারত থেকে অস্ত্র পাচারেরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের উজানীনগর গ্রামে অবস্থিত বেন্ডিস করিমের বিলাসবহুল তিনতলা ভবনটি দীর্ঘ দিন ধরে মানবপাচারের ‘সেফ হাউস’ বা ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নারী, শিশু ও পুরুষদের প্রলোভন দেখিয়ে এনে এখানে গোপনে রাখা হতো। পরে সুযোগ বুঝে দালালের মাধ্যমে তাদের ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করা হতো। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের মাধ্যমে পাচার হওয়া নারী ও শিশুদের ভারতের বিভিন্ন যৌনপল্লীতে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়, যা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বেন্ডিস করিমের চাতুর্যের গল্প। বর্তমানে তিনি ‘চিকিৎসার অজুহাতে’ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন। তবে সেখানে নিরাপদ দূরত্বে বসেই তিনি বাংলাদেশে থাকা তার প্রধান দুই সহযোগী মো. হানিফ মিয়া ও কবির আহমদকে দিয়ে পুরো পাচার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। এই সিন্ডিকেটটি জনপ্রতি ২০ থেকে ৫০ হাজার রুপির চুক্তিতে সীমান্ত পারাপার ও মানুষ কেনাবেচার এই রুদ্ধশ্বাস ব্যবসা পরিচালনা করছিল।
১৭ মে দুপুরে উজানীনগর এলাকায় বেন্ডিস করিমের বাড়িতে এক চাঞ্চল্যকর অভিযান চালায় স্থানীয় জনতা ও পুলিশ। স্থানীয়রা দীর্ঘ দিন ধরে ওই বাড়িতে সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করে আসছিলেন। এদিন তারা সম্মিলিতভাবে বাড়িটি ঘেরাও করলে ভেতরে নারী ও শিশুসহ ১৪ জনকে বন্দি অবস্থায় দেখতে পান।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা হানিফ মিয়া পরিচয় লুকাতে শাড়ি পরে নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করেন এবং পলায়নের চেষ্টা করেন। তবে ধূর্ত হানিফকে চিনে ফেলে স্থানীয় জনতা। উত্তেজিত জনতা তাকে ধাওয়া করে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। পরবর্তীতে ১৮ মে বিকেলে পুলিশি অভিযানে এই চক্রের আরেক অন্যতম সদস্য কবির আহমদকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
অভিযানে ৯ জন নারী, ৩ জন পুরুষ ও ১ জন শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। তারা দেশের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উদ্ধারকৃতরা জানান, গভীর রাতে দালালের মাধ্যমে সীমান্ত পার করে তাদের এই বাড়িতে এনে বন্দি করে রাখা হয়েছিল।
এই ঘটনায় জাফলং এলাকার বাসিন্দা এশা আক্তার বাদী হয়ে জৈন্তাপুর থানায় ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে’ একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বেন্ডিস করিম কেবল মানবপাচারেই সীমাবদ্ধ নন; তার বিরুদ্ধে ভারত থেকে চিনি, কসমেটিকস ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য অবৈধভাবে দেশে আনার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র পাচারের অভিযোগও উঠেছে। এই সিন্ডিকেটটি এলাকায় এতটাই বেপরোয়া যে, বিভিন্ন সময় সীমান্তে টহলরত বিজিবি সদস্য ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালাতেও তারা দ্বিধা করেনি।
জৈন্তাপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, সীমান্ত এলাকায় অপরাধ দমনে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পাচারকারী চক্রের দুই অন্যতম সদস্য হানিফ ও কবিরকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। মানবপাচার ও চোরাচালানের ক্ষেত্রে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি। এই চক্রের মূল হোতাসহ বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বেন্ডিস করিমের মতো প্রভাবশালী গডফাদারদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনলে সীমান্ত এলাকা সাধারণ মানুষের জন্য অনিরাপদ থেকে যাবে। তারা এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের সমূলে বিনাশ চান।