তবে কি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনিশ্চিত হয়ে গেল? নইলে রাষ্ট্রপতি ভবনের এমন ঘোষণা আসবেই–বা কেন এবং এক ঘণ্টার মধ্যে তা প্রত্যাহারই–বা কেন করে নেওয়া হবে? শুক্রবার দুপুরে এটাই ছিল তুমুল জল্পনার বিষয়। যদিও রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোষণার নেপথ্য কারণ রহস্যাবৃত রইল।
তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে কয়েক দিন ধরেই দুই দেশের কূটনৈতিক মহল সরগরম। একটা সময় মনে করা হচ্ছিল, ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেওয়ার আগেই দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে আসবেন তারেক রহমান। সেই সম্ভাবনা জোরালো হওয়ার সময়েই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতে আশ্রয়প্রাপ্ত দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়। ভারতে আশ্রিত হাসিনার ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে কিছু নিশ্চয়তা বা শর্তও আরোপ করা হয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। তার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে জল্পনা থিতিয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার বেলা দুইটা নাগাদ চলে আসে রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোষণা এবং তারই ওপর ভিত্তি করে প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর (পিআইবি) বিজ্ঞপ্তি।
রাষ্ট্রপতির ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি নাভিকা গুপ্ত বেলা ২টা ১৩ মিনিটে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানান, শনিবার রাষ্ট্রপতি ভবনে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান হবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা জানানোর জন্য ওই সময় পূর্ণ রিহার্সাল হবে। রাষ্ট্রপতি ভবনের ওই ঘোষণা পিআইবিও একটু পরেই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেয়। ফলে শুরু হয় থমকে যাওয়া সফর ঘিরে নতুন জল্পনা।
গণমাধ্যমও সঙ্গে সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একের পর এক প্রশ্ন হতে থাকে। জানতে চাওয়া হয় তবে কি তারেক রহমান আসছেন? কিছু সময় পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই ঘোষণা সঠিক নয়। পিআইবি ওয়েবসাইট থেকে বিজ্ঞপ্তিটি সরিয়ে দেওয়া হয়। বেলা ৩টা ৩২ মিনিটে নাভিকা গুপ্তও জানিয়ে দেন, আগের ঘোষণা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। কোথাও যে কারও একটা ভুল হয়েছে, বোঝা গেলেও কার ভুল এবং কী করে এমন ভুলটা হলো, তা রহস্যময় থেকে গেল।
বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, তারেক রহমানের ভারত সফর চূড়ান্ত ধরে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর দিল্লি সফরের পর সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়। সে অনুযায়ী ২২ আগস্ট শনিবারের রাষ্ট্রপতি ভবনের ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২৪ তারিখে হায়দরাবাদ হাউসে নৈশভোজও সুনিশ্চিত করা ছিল। শোনা যাচ্ছে, অনেকের কাছে আমন্ত্রণপত্রও নাকি পাঠানো হয়েছিল। যদিও সরকারিভাবে এসব খবরের কোনো সমর্থন মেলেনি।
তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এত বড় ভুলটা হলো কী করে। কে বা কারা তার জন্য দায়ী। সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর কোনো মহলে নেই। রাষ্ট্রপতি ভবনে ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান সামরিক বাহিনীর এক পুরোনো ঐতিহ্য। প্রতি শনিবার সকালে ওই অনুষ্ঠান হয়, যখন রাষ্ট্রপতির সুরক্ষায় নিযুক্ত পুরোনো রক্ষীরা নতুন রক্ষী বাহিনীর হাতে দায়িত্ব সঁপে বিদায় নেন। দৃষ্টিনন্দন এই সামরিক অনুষ্ঠানে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর কুচকাওয়াজ হয়। সামরিক ব্যান্ডের ঝংকার শোনা যায়। সর্বসাধারণের জন্য অনুষ্ঠানের টিকিটও বিক্রি হয়। রাষ্ট্রপতি ভবনের মোরাম বিছানো প্রশস্ত আঙিনায় এই সামরিক অনুষ্ঠান চলে প্রায় ৫০ মিনিট।
শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, তেমন কোনো খবর থাকলে জানানো হবে।
স্পষ্টতই, চলতি মাসে দ্বিপক্ষীয় সফরে আসার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, আপাতত তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে। তবে দুই দেশের ওয়াকিবহাল মহল অনুযায়ী, এ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে বাক্যালাপ অব্যাহত আছে।
সফরের আয়োজন নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই
প্রথম আলোর কূটনৈতিক প্রতিবেদক জানান, ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো তা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের আয়োজন নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ফলে ভারত সফর নিয়ে প্রস্তুতির কোনো সুযোগ নেই।
তবে সরকারের একাধিক সূত্র সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরের বিষয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক স্তরের নির্দেশনায় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী রয়টার্সকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় আছে ঢাকা।