বিদেশে উন্নত জীবনের আশায় প্রতি বছর সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো মানুষ পাড়ি জমাচ্ছেন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। তবে এই স্বপ্নের পথেই অনেকেই পড়ছেন দালাল বা অসাধু এজেন্টদের প্রতারণার ফাঁদে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, যাচাই-বাছাই ছাড়া এজেন্ট নির্বাচন এবং নিরাপদ লেনদেন পদ্ধতি অনুসরণ না করার কারণেই অধিকাংশ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অভিযোগে দেখা গেছে, কথিত এজেন্টরা আকর্ষণীয় চাকরি, দ্রুত ভিসা কিংবা কম খরচে বিদেশ পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভিসা না দেওয়া, যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা মাঝপথে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা বা আইনি জটিলতার ভয়ে অভিযোগ করেন না, ফলে প্রতারক চক্র আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে,গ্যারান্টিযুক্ত ভিসা,ভিআইপি প্রসেসিং বা মাত্র এক-দুই মাসে বিদেশ পাঠানো—এ ধরনের চটকদার ও অবাস্তব প্রতিশ্রুতিই প্রতারণার সবচেয়ে বড় ফাঁদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রলোভনে পড়ে অনেকেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন, যাচাই-বাছাই না করেই অর্থ পরিশোধ করেন। অথচ বাস্তবতা হলো, ভিসা প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট দেশের নির্ধারিত নীতিমালা ও যাচাইয়ের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়, যা স্বাভাবিকভাবেই সময়সাপেক্ষ। ।
এ বিষয়ে নগরীর আলমপুরের বাসিন্দা মো. মহিউদ্দিন বলেন-বিদেশে যাওয়ার আশায় এক এজেন্টের কথায় বিশ্বাস করে আমি বড় অঙ্কের টাকা দিয়েছিলাম। তিনি আমাকে দ্রুত ভিসা ও ভালো চাকরির আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরে যোগাযোগ করতে গেলে নানা অজুহাত দিতে থাকেন, একপর্যায়ে তার সঙ্গে আর যোগাযোগই সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন- শুরুতে এজেন্টটি খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বললেও পরে ধীরে ধীরে সন্দেহ তৈরি হয়। কোনো কাগজপত্র স্পষ্টভাবে দেখানো হয়নি, শুধু আশ্বাস দিয়েই সময় পার করা হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি, লিখিত চুক্তি ও ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন না করাটা ছিল বড় ভুল। আমার মতো অন্য কেউ যেন এমন প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য সবাইকে আরও সতর্ক হওয়া উচিত।
নগরীর সুবিদবাজার এলাকার বাসিন্দা, বর্তমানে ফ্রান্স প্রবাসী মো. জুনেদ আহমদ বলেন-প্রায় এক বছর আগে বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় আমি প্রতারণার শিকার হয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ হারাই। শুরুতে নানা আশ্বাস পেলেও পরে বুঝতে পারি পুরো বিষয়টি ছিল পরিকল্পিত প্রতারণা। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাকে নতুন করে চেষ্টা করতে হয়েছে, সময় ও অর্থ দুটোরই বড় মূল্য দিতে হয়েছে। পরে বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অবশেষে ফ্রান্সে আসতে সক্ষম হয়েছি। এখন মনে করি, শুরু থেকেই যাচাই-বাছাই করে এবং সঠিক নিয়মে এগোলে এই ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো না।
শুধু লেনদেন নয়, দালাল বা এজেন্টের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকতে হবে—কোন দেশে পাঠানো হবে, কাজের ধরন কী, মোট খরচ কত, কীভাবে কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে, ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাব্য সময়সীমা এবং ব্যর্থ হলে অর্থ ফেরতের শর্ত। প্রয়োজনে এই চুক্তিপত্র নোটারি করা এবং সাক্ষীর স্বাক্ষর রাখা হলে তা আইনি সুরক্ষা আরও জোরদার করে।
এ বিষয়ে আইনজীবী শেখ শিরিন আক্তার বলেন-বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় দালাল বা এজেন্টের কাছে অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ এ খাতে প্রতারণার ঘটনা তুলনামূলক বেশি।
তিনি আরও বলেন-প্রতিবার অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করা উচিত, যাতে এর প্রমাণ সংরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি এজেন্টের সঙ্গে একটি সুস্পষ্ট লিখিত চুক্তি করা প্রয়োজন, যেখানে শর্তাবলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে—এতে ভবিষ্যতে আইনি সুরক্ষা পাওয়া সহজ হয়।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বৈধতা যাচাই করাও অত্যন্ত জরুরি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা থেকে তথ্য যাচাই না করে কোনো এজেন্টের সঙ্গে চুক্তি না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক সময় প্রতারকরা ভুয়া লাইসেন্স দেখিয়ে বা অন্য প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
এ বিষয়ে ড্রিম সলিউশন গ্রুপের স্বত্বাধিকারী ইঞ্জিনিয়ার জসিম উদ্দিন বলেন- দালালদের খপ্পরে পড়ে অতি লোভে দক্ষতা অর্জন না করে অবৈধ পথে পা বাড়ানো টাকা ও জীবন দু'টিতেই ঝুঁকি। অনেকেই কম খরচ বা দ্রুত ভিসার প্রলোভনে পড়ে সিদ্ধান্ত নেন, যা পরে বড় ক্ষতির কারণ হয়। প্রবাস প্রত্যাশীদের উচিত সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সঠিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এবং প্রতিটি ধাপে লিখিত প্রমাণ রাখা।
তিনি আরও বলেন, বিদেশ যাওয়ার আগে অন্তত যেকোনো একটি কাজ (যেমন: এসি মেরামত, ইলেকট্রিক কাজ, রাজমিস্ত্রি, বা ড্রাইভিং) শিখে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া গন্তব্য দেশের ভাষার উপর একটা কোর্স সম্পন্ন করে তবে সে দেশে যাওয়া উচিত ।
এ বিষয়ে সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুর রহমান বলেন- এ ধরনের প্রতারণা রোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হলেও ভুক্তভোগীদের সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত থানায় অভিযোগ করা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে জানানো প্রয়োজন। এতে প্রতারক চক্র শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা সহজ হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদ আর্থিক লেনদেন এবং প্রমাণ সংরক্ষণ। তারা জোর দিয়ে বলেন, কোনো অবস্থাতেই নগদ টাকায় বড় অঙ্কের লেনদেন করা উচিত নয়। প্রতিবার অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে টাকা দেওয়া উচিত। এতে লেনদেনের একটি স্পষ্ট রেকর্ড থাকে, যা ভবিষ্যতে প্রতারণার শিকার হলে আইনি সহায়তা পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ বিষয়ে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থাপক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টিআইপি হিরো অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত আল-আমিন নয়ন বলেন-নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সচেতনতা ও সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ। আমাদের কাছে আসা বেশিরভাগ অভিযোগেই দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা কোনো লিখিত চুক্তি ছাড়া এবং নগদে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করেছেন। ফলে প্রতারণার শিকার হলেও তাদের পক্ষে আইনি সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত এবং প্রতিটি লেনদেন ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দালাল বা এজেন্টের দেওয়া যেকোনো প্রলোভন—যেমন দ্রুত ভিসা বা গ্যারান্টিযুক্ত সুযোগ—এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সঠিক তথ্য যাচাই এবং লিখিত প্রমাণ সংরক্ষণই পারে একজন প্রবাসপ্রত্যাশীকে প্রতারণা থেকে সুরক্ষা দিতে।