দুর্গাপূজা মানেই অশুভ শক্তির বিনাশ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয়, অসুরত্বের বিরুদ্ধে দেবীত্বের প্রতিষ্ঠা। মা দুর্গা শক্তির প্রতীক, অন্যায়ের বিনাশকারী এবং অসুরমর্দিনী হিসেবে পূজিত হন। কিন্তু সমাজের দিকে তাকালে কখনো কখনো এমন এক নির্মম পরিহাস চোখে পড়ে, যা আমাদের ধর্মীয় চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ ও বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। যে মানুষেরা নিজের বাবা-মায়ের মুখে খাবার তুলে দেয়নি বা দিচ্ছে না, যাদের অবহেলায় বৃদ্ধ মা-বাবা অনাহারে, অসহায়ত্বে কিংবা অবহেলায় দিন কাটান, যারা মা-বাবা, ভাই-বোনের সঙ্গে অমানবিক ও অসুরীয় আচরণ করেছেন বা করছেন, তারাই যখন অসুরমর্দিনী মা দুর্গার পূজার দায়িত্বে থাকেন, তখন প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সত্যিই অসুরত্বকে পরাজিত করতে চাই, নাকি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে নিজেদের ভেতরের অসুরকে আড়াল করতে চাই?
মা দুর্গার পূজা কেবল প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজানো, ঢাকের বাদ্য কিংবা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের নাম নয়। এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, অশুভ শক্তির বিনাশ করা এবং শুভবোধের জাগরণ ঘটানো। অসুরমর্দিনীর আরাধনা আমাদের শেখায়, মানুষের ভেতরে থাকা অহংকার, নিষ্ঠুরতা, লোভ, হিংসা ও অমানবিকতাকে পরাজিত করতে হবে। অথচ আমরা যদি মণ্ডপে দাঁড়িয়ে অসুরবিনাশিনীর বন্দনা করি, আর ঘরে ফিরে নিজের জন্মদাতা বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যাই, তবে আমাদের পূজার প্রকৃত শিক্ষা কোথায়?
যে মা নিজের সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য অসংখ্য কষ্ট সহ্য করেছেন, যে বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদেরই যদি সন্তানের অবহেলা সহ্য করতে হয়, তবে তা কেবল পারিবারিক ব্যর্থতা নয়-এ এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। যে সন্তান বাবা-মায়ের সামর্থ্য ফুরিয়ে গেলে তাঁদের বোঝা মনে করে, যাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেয়, অথচ সমাজে ধর্মপ্রাণ ও দানশীল হিসেবে পরিচিত হতে চায়, তার ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে তার মানবিক আচরণের বিরাট বৈপরীত্য তৈরি হয়।
একইভাবে, ভাই-বোনের সঙ্গে অন্যায় আচরণ, অসহায় আত্মীয়কে অপমান, পরিবারের দুর্বল সদস্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া কিংবা ক্ষমতার দম্ভে আপনজনকে কষ্ট দেওয়াও মানুষের ভেতরের অসুরত্বের প্রকাশ হতে পারে। অসুরত্ব কেবল পৌরাণিক কাহিনির কোনো চরিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটতে পারে। যখন বিবেকের জায়গায় স্বার্থ, ভালোবাসার জায়গায় নিষ্ঠরতা এবং দায়িত্বের জায়গায় অবহেলা স্থান নেয়, তখন মানুষের বাহ্যিক ধর্মাচরণ তার অন্তরের সত্যকে ঢেকে রাখতে পারে না।
তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক-যারা নিজের পরিবারের মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে পারেন না, তারা কীভাবে অসুরবিনাশিনীর পূজার প্রকৃত তাৎপর্য ধারণ করবেন? যারা ঘরের অসহায় মা-বাবার কষ্ট দেখতে পান না, তারা মণ্ডপে দাঁড়িয়ে দেবীর করুণার মাহাত্ম্য কীভাবে উপলব্ধি করবেন? যারা আপনজনের চোখের জলকে উপেক্ষা করেন, তারা কীভাবে দেবীর কাছে শান্তি, মঙ্গল ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন?
অবশ্যই, কোনো ব্যক্তির পারিবারিক জীবনের সব ঘটনা বাইরে থেকে জানা সম্ভব নয়। কখনো আর্থিক অক্ষমতা, অসুস্থতা, সম্পর্কের জটিলতা কিংবা অন্য বাস্তব পরিস্থিতিও দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই কাউকে যাচাই না করে অসুর আখ্যা দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। কিন্তু সামর্থ্য ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাবা-মাকে বঞ্চিত করেন, তাদের অবহেলা করেন কিংবা আপনজনের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন, তবে তার সেই আচরণের নৈতিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালন করাও জরুরি।
দুর্গাপূজার আয়োজনে অর্থ, শ্রম, সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই আয়োজনের মহিমা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন আয়োজকদের জীবনেও দেবীর আদর্শের প্রতিফলন ঘটে। মণ্ডপে আলোর ঝলকানি থাকল, অথচ নিজের ঘরের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনে অন্ধকার রয়ে গেল এ কেমন পূজা? দেবীর প্রতিমার সামনে ফুলের স্তূপ জমল, অথচ নিজের মায়ের প্রয়োজনের সময় একটি সামান্য সাহায্যের হাতও বাড়ল না-এ কেমন ভক্তি? ঢাকের শব্দে চারপাশ মুখরিত হলো, অথচ অসহায় মা-বাবার দীর্ঘশ্বাস কারও কানে পৌঁছাল না-এ কেমন ধর্মীয় উৎসব?
দেবীকে পূজা করার আগে দেবীর শিক্ষাকে নিজের জীবনে ধারণ করাই প্রকৃত ভক্তির পরিচয়। মা দুর্গার আরাধনা যদি আমাদের হৃদয়কে কোমল না করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেককে জাগ্রত না করে এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ না করে, তবে সেই আরাধনার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।
যারা দুর্গাপূজার দায়িত্বে থাকেন, তাদের প্রতি তাই বিনীত আহ্বান মণ্ডপের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি নিজেদের চরিত্রের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করুন। দেবীর সামনে দাঁড়ানোর আগে একবার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়ান। ভাবুন, আপনার বাবা-মা কেমন আছেন, তাঁদের প্রয়োজনগুলো পূরণ হচ্ছে কি না, আপনার আচরণে ভাই-বোন কিংবা পরিবারের অন্য কেউ অকারণে কষ্ট পাচ্ছেন কি না। নিজের ভুল থাকলে তা স্বীকার করুন, অবহেলিত আপনজনের পাশে দাঁড়ান এবং সম্পর্কের ক্ষত সারানোর চেষ্টা করুন। কারণ মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে সংশোধন করার মধ্যেই তার মহত্ত্ব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অসুরমর্দিনীর পূজা শুধু অসুরের মূর্তি বধের প্রতীকী আয়োজন নয়; এটি মানুষের অন্তরের অসুরত্বকে পরাজিত করারও এক গভীর আহ্বান। যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, দুর্বলের পাশে থাকে, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করে এবং আপনজনের প্রতি মানবিক আচরণ করে, সে-ই দেবীর আদর্শকে বাস্তব জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করে।
পরিশেষে বলতে চাই, অসুরমর্দিনীর পূজার দায়িত্ব পালন করা আর নিজের ভেতরের অসুরকে পরাজিত করা এক বিষয় নয়। প্রথমটি একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব; দ্বিতীয়টি আত্মশুদ্ধি, বিবেক ও মানবিকতার কঠিন পরীক্ষা। যারা পূজার আয়োজন করেন, তাদের প্রত্যেকের জীবনেই যেন সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার আন্তরিক চেষ্টা থাকে।
মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা-তিনি যেন আমাদের বাহ্যিক আড়ম্বরের মোহ থেকে মুক্ত করে অন্তরের সত্যকে চিনতে শেখান। আমাদের অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, অবহেলার পরিবর্তে দায়িত্ববোধ, নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে মমতা এবং স্বার্থপরতার পরিবর্তে মানবিকতা দান করেন।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এই নয় যে, কে কত বড় মণ্ডপ নির্মাণ করলেন কিংবা কে কত জাঁকজমক করে পূজার আয়োজন করলেন। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—দেবীর আরাধনা করতে গিয়ে আমরা নিজেদের ভেতরের অসুরকে কতটা পরাজিত করতে পারলাম?