‘দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে।’—শহীদ জননী জাহানারা ইমামের উদ্দেশে শহীদ রুমীর দেওয়া এই বহুল আলোচিত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে তাঁর দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় শহীদ রুমী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা নতুন প্রজন্মের কাছে শহীদ রুমীর জীবন, দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
শনিবার (২৯ আগস্ট) বেলা ১১টায় উপজেলার শ্রীপুর মাদ্রাসাবাজার এলাকার হিরা-গুলজান একাডেমি অ্যান্ড জুনিয়র হাইস্কুলে শহীদ রুমী স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে এ আলোচনা সভা ও কুইজ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়।
মুক্তকুড়ি ওপেন স্কাউট গ্রুপের সম্পাদক মো. বিল্লাল হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন হিরা-গুলজান একাডেমি অ্যান্ড জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. এনামুল হক চৌধুরী।
বিশেষ অতিথি ছিলেন শহীদ রুমী স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা সাদিয়া নোশিন তাসনিম, বাসদ (মার্কসবাদী) কুলাউড়া উপজেলা শাখার সদস্য সচিব সাদমান সৌমিক মজুমদার, সদস্য সুমন দেব, নুরুল ইসলাম ফয়সাল, শিক্ষক সঞ্জয় দেবনাথ এবং শ্রীপুর বাজারের ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি মো. সাদেকুজ্জামান।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, শহীদ রুমী ছিলেন দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের ভবিষ্যৎ ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।
বক্তারা বলেন, শহীদ রুমীর জীবন ও আদর্শ কেবল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ নয়; তাঁর দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগ তরুণ প্রজন্মকে দেশ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তাই তাঁর জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরতে হবে।
অনুষ্ঠানে শহীদ রুমীর তাঁর মা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যের অংশবিশেষ সম্বলিত একটি স্মারক বুকমার্ক প্রদর্শন করা হয়। সেখানে রুমীর বক্তব্য হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, ‘আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মতো অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়তো বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের সামনে কোনোদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?’
বক্তারা বলেন, এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের প্রতি শহীদ রুমীর গভীর ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরে শহীদ রুমী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, শহীদ রুমী ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন গেরিলা যোদ্ধা। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার দিনটি ৩০ আগস্ট শহীদ রুমী দিবস হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর আত্মত্যাগের স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেই প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়।