বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

ছাতক-সিলেট রেলপথ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, কাজ হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ

সুনামগঞ্জের ছাতক-সিলেট রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। ২১৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ঐতিহ্যবাহী এই রেলপথে কবে ট্রেন চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

গত রোববার (২৩ আগস্ট) প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। অথচ প্রকল্পের আওতায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনও বাকি। নতুন রেললাইন স্থাপন, সেতু ও কালভার্ট সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।

সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথটি ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকে রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের লোহার পাত, স্লিপার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যায়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ে সিলেট-ছাতক বাজার অংশের মিটারগেজ রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটির নাম ‘২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটার গেজ ট্র্যাক) পুনর্বাসন প্রকল্প’।

জিওবি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরে একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের (এমএএইচএল) সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ৯৬টি ফাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে পুরো প্রকল্পের অগ্রগতি এখনও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। মাটি ভরাট, কালভার্ট ও অন্যান্য অবকাঠামোগত কাজ চললেও নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনও বাকি।

ইতোমধ্যে ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে। তবে ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, তাজপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ এবং সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চী, সৎপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কার ও পুনর্বাসনের কাজ থেমে আছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শুরু থেকেই ধীরগতিতে এগিয়েছে। ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সমন্বয় নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোথাও সড়কের মাটি ভরাটের পর রেলপথের উচ্চতা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের ধীরগতির পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ছাতকের পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আবুল হাসান বলেন, ছাতকের সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালি, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে এ রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। স্বল্প খরচে সিলেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতেরও অন্যতম মাধ্যম ছিল এটি।

তিনি বলেন, ‘২০২২ সালের বন্যার পর রেলপথ বন্ধ রয়েছে। সংস্কার কাজ শুরু হওয়ায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাটি ভরাট ছাড়া তেমন কোনো কাজ আমাদের নজরে পড়েনি। সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে।’

ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, নতুন করে রেলপথ সংস্কারের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। কিছুদিন বিভিন্ন স্থানে কাজ চললেও পরে কার্যক্রম অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে কাজ কেন বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে স্থানীয়রা পরিষ্কার কোনো তথ্য পাচ্ছেন না।

কুমনা গ্রামের শিক্ষার্থী অলিউর রহমান অলিদ বলেন, ‘এক যুগ আগেও ছাতক ও দোয়ারাবাজার এলাকার শিক্ষার্থীরা ট্রেনে করে সিলেটে গিয়ে এমসি কলেজ, মদন মোহন কলেজ ও টেকনিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করতেন। ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন সেই সুযোগ নেই।’

রেলওয়ের সিলেট-ছাতক বাজার অংশের রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, ৯৬টি ফাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজও দ্রুত চলছে।

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে। বাকি রয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পের মেয়াদ গত ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। এখন প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও বাস্তবায়নের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন।’

এদিকে প্রায় ৭২ বছর আগে নির্মিত এই রেলপথটি ছাতকের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ১৯৫৪ সালে সিলেট থেকে ছাতক বাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এ রেলপথ দিয়ে ছাতক থেকে চুনাপাথরসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করা হতো। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মানুষও সিলেটসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাতায়াতে এ রেলপথ ব্যবহার করতেন।

জেলার খাদ্যগুদামের মালামালও একসময় রেলপথে ছাতক পর্যন্ত আনা হতো। পরে নৌপথে সেগুলো জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রেলপথটির পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজের বড় অংশ বাকি থাকায় এখন নতুন করে মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, বাড়ালে কতদিনের জন্য বাড়ানো হবে এবং কবে নাগাদ পুরো রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন স্থানীয়রা।

এই সম্পর্কিত আরো