প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিং এবং বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার ভেলকিবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মানুষ। দিন-রাত মিলিয়ে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কখন বিদ্যুৎ থাকবে আর কখন চলে যাবে—এর কোনো নির্দিষ্টতা নেই। কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করায় একদিকে যেমন গরমে অতিষ্ঠ হতে হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও দৈনন্দিন কাজকর্মেও দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা।
বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানি ওঠানোর মোটর চালানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক এলাকায় পানির সংকটও তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজ ও ডিপ ফ্রিজে রাখা মাছ-মাংস, দুধ, আইসক্রিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়েছে দিরাইয়ের ব্যবসা-বাণিজ্যে। দোকানপাট, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, মিষ্টির দোকান, ফার্মেসি, ফটোকপি ও কম্পিউটারভিত্তিক প্রতিষ্ঠানসহ বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান, লাইট, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফটোকপি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে কাজের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদেরও ফিরে যেতে হচ্ছে।
রেস্টুরেন্ট, হোটেল, মিষ্টির দোকান ও খাবারের ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজ ও ডিপ ফ্রিজ ঠিকমতো কাজ না করায় খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে ব্যবসায়ীদের একদিকে পণ্য নষ্ট হওয়ার ক্ষতি, অন্যদিকে বিক্রি কমে যাওয়ার ক্ষতি—দুই দিকই সামলাতে হচ্ছে।
বিকল্প বিদ্যুৎ হিসেবে জেনারেটর, আইপিএস কিংবা ইনভার্টার ব্যবহার করছেন কেউ কেউ। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেরই এসব ব্যবস্থা ব্যবহারের সামর্থ্য নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে তাদের ব্যবসা কার্যত বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক বাসাবাড়িতে পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে। বিদ্যুতের মোটরের মাধ্যমে পানি ওঠানোর ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো বিদ্যুৎ না থাকলে মোটর চালাতে পারছে না।
এতে রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া, অজু ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে বাড়তি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে ধর্মীয় কার্যক্রমেও। স্থানীয় মুসল্লিদের অভিযোগ, বিভিন্ন ওয়াক্তের নামাজের সময় বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মসজিদে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে জোহর, আসর ও এশার সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় গরমের মধ্যে নামাজ আদায় করা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। বয়স্ক ও অসুস্থ মুসল্লিদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে গরম ও অন্ধকারের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনলাইন ক্লাস, কম্পিউটারভিত্তিক পড়াশোনা এবং মোবাইল-ল্যাপটপে শিক্ষামূলক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ফার্মেসিতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগও বাড়ছে।
এ ছাড়া ওয়েল্ডিং, কাঠের কাজ, মেরামতকেন্দ্র, ধান-চাল প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা বিদ্যুৎনির্ভর হওয়ায় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন ও কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচও বাড়ছে।
দিরাই বিদ্যুৎ সরবরাহের আবাসিক প্রকৌশলী পরশুরাম তরফদার জানান, দিরাই পিডিবির বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৬ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, বরাদ্দের তুলনায় বিদ্যুতের চাহিদা বেশি হওয়ায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এ তথ্য অনুযায়ী, দিরাইয়ে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। ফলে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে উপজেলার বাসিন্দাদের।
তবে শুধু পিডিবির আওতাধীন এলাকাই নয়, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ থাকা এলাকাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রচণ্ড গরমের সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।