সিলেট শিক্ষা বোর্ডে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন পাসের হার হয়েছে। চলতি বছর সিলেট বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশে। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ১০ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
তবে পাসের হার কমলেও বেড়েছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। এবার সিলেট বোর্ডে ৩ হাজার ৮৩৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬১৪ জন। এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ২২২ জন।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াসমিন।
পাসে মেয়েরা এগিয়ে
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল বিবরণী অনুযায়ী, এবার মোট ৮৯ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫১ হাজার ৯৫৭ জন।
পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে ১৯ হাজার ৮৮৯ জন এবং মেয়ে ৩২ হাজার ৬৮ জন। ছেলেদের পাসের হার ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ, আর মেয়েদের ৫৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাসের হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
পাঁচ বছরে ধারাবাহিক পতন
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের গত পাঁচ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাসের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
২০২২ সালে সিলেট বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৭৬ দশমিক ০৬ শতাংশে। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এবার তা আরও কমে হয়েছে ৫৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
অর্থাৎ ২০২২ সালের তুলনায় পাঁচ বছরের ব্যবধানে সিলেট বোর্ডে পাসের হার কমেছে ২০ দশমিক ৪৯ শতাংশীয় পয়েন্ট।
অন্যদিকে, জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ২০২২ সালে ৭ হাজার ৫৬৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ৫ হাজার ৪৫২ জন এবং ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৪৭১ জন। ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬১৪ জন। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৮৩৬ জন।
বিজ্ঞানে ভালো, মানবিকে তলানিতে
বিভাগভিত্তিক ফলাফলে সবচেয়ে ভালো করেছে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ বিভাগে পাসের হার ৮০ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২৫ হাজার ৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২০ হাজার ১৫৯ জন।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৩ শতাংশ। এ বিভাগে ৬ হাজার ২২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৩ হাজার ৯৮৩ জন।
তবে মানবিক বিভাগের ফলাফল সবচেয়ে খারাপ। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ৫৭ হাজার ৭৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ২৭ হাজার ৮১৫ জন। অর্থাৎ এ বিভাগের অর্ধেকেরও বেশি পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
জেলাভিত্তিক ফলে সিলেট সেরা
জেলাভিত্তিক ফলাফলে চার জেলার মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে সিলেট জেলা। এ জেলায় ৩৫ হাজার ২৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২২ হাজার ১৬০ জন। পাসের হার ৬২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ জেলা থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মৌলভীবাজার। জেলার ১৯ হাজার ৮৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১১ হাজার ১০৩ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭২৫ জন।
হবিগঞ্জে ১৫ হাজার ৬৯৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮ হাজার ৬৯৫ জন। পাসের হার ৫৫ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৭৫ জন।
চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে সুনামগঞ্জ। এ জেলার ১৮ হাজার ২৮৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৯ হাজার ৯৯৯ জন। পাসের হার ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১৩ জন।
শতভাগ পাসের প্রতিষ্ঠান বেড়েছে
পাসের হার ব্যাপকভাবে কমলেও শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। এবার সিলেট বোর্ডের ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৭টি।
তবে এবার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার শূন্য হয়নি।
সামগ্রিক ফলাফলে পাসের হারে বড় পতন সিলেট বোর্ডের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগের মাত্র ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ পাসের হার ফলাফলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে। একই সময়ে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফলাফলে এক ধরনের বৈপরীত্যও দেখা গেছে।