বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

ছাতকের কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের দানকৃত ভূমি বেহাতের শঙ্কা

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার জাউয়া বাজার ইউনিয়নের কৈতক ২০ শয্যা হাসপাতালের দানকৃত সরকারি ভূমি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রেকর্ড ও নামজারি হালনাগাদ না হওয়ায় হাসপাতালের দানকৃত ভূমির একটি অংশ ব্যক্তি মালিকানায় বিক্রি ও দখলের চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের পক্ষে চিফ মেডিকেল অফিসারের অনুকূলে দুটি পৃথক সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে মোট ১৮ জন দাতা ব্যক্তি কৈতক হাসপাতালের জন্য ২৭ কেদার ভূমি দান করেন। দলিল নং-৭৯২ অনুযায়ী গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থসহ ১২ জন এবং দলিল নং-৭৯৩ অনুযায়ী তাহির আলীসহ ৬ জন এ ভূমি দান করেন।

বর্তমানে ওই ভূমির ওপর হাসপাতালের বিভিন্ন স্থাপনা, সড়ক ও নৌকাঘাট রয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালের নামে ভূমিগুলো নামজারি ও রেকর্ডভুক্ত না হওয়ায় সেগুলো পূর্বের মালিকদের নামে থেকেই যায়।

এ সুযোগে ভূমিদাতা গোপিকা ভূষণ পুরকায়স্থের উত্তরাধিকারীরা হাসপাতালের জন্য দান করা জমির অংশবিশেষ পুনরায় বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ২০১২ সালে গোপতি প্রিয় পুরকায়স্থ ও গকোলেন্দু পুরকায়স্থ ৭ শতাংশ এবং তাপস পুরকায়স্থ আরও ৪ শতাংশ ভূমি পৃথক দুটি দলিলের মাধ্যমে দুই ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিক্রিত জমির একটি অংশ হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে এবং অন্য অংশে হাসপাতালের প্রবেশ সড়ক রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব জমি দানকৃত ভূমির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিক্রেতাদের সেখানে কোনো মালিকানা থাকার কথা নয়।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ২০১২ সালে এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ওই জমিতে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীর বাধার মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভূমি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট) করতে গেলে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।

বিষয়টি জানার পর সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রশাসনকে অবহিত করেন। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিকে ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্থানীয়দের উদ্যোগে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ১৫ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে দানকৃত ভূমি হাসপাতালের নামে নামজারি ও রেকর্ডভুক্তকরণ এবং বিতর্কিত নামজারি বাতিলের দাবি জানানো হয়।

ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিনও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করেন।

সূত্র জানায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টির শুনানির জন্য ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করেন এবং সার্ভে করে যৌথ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। তবে এখনো প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

এদিকে ভূমি বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক মামলার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের জমি রক্ষায় সোচ্চার হওয়ায় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সমাজকর্মীকে আসামি করে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কৈতক গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা হাজী আব্দুস সোবহান বলেন, ‘যে জমি বহু বছর আগে হাসপাতালের নামে দান করা হয়েছে, সেই জমি আবার বিক্রির ঘটনা বিস্ময়কর। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।’

ভূমিদাতাদের এক উত্তরাধিকারী ঈমান আলী বলেন, ‘যদি দানকৃত জমি উদ্ধার করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য দানকৃত সম্পত্তিও ঝুঁকির মুখে পড়বে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’

এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুসরাত আরেফিন বলেন, ‘বিষয়টি সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেখছেন। তদন্ত ও পরিমাপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দানকৃত সরকারি ভূমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে দ্রুত জরিপ সম্পন্ন করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ সুরক্ষিত থাকে এবং চলমান বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়।

এই সম্পর্কিত আরো