বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

বয়সের ভারে থেমে যায় তালি, অনিশ্চয়তায় কাটে বৃদ্ধ হিজড়াদের জীবন

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার একটি ভাড়া বাসার ছোট্ট কক্ষে একা বসে ছিলেন ৬৫ বছর বয়সী আলেয়া হিজড়া। একসময় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে কিংবা নবজাতকের বাসায় গিয়ে আশীর্বাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। তবে বয়সের ভার ও নানা শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর আগের মতো চলাফেরা বা কাজ করতে পারেন না। ফলে মাসের বেশিরভাগ সময়ই তাকে অন্যদের সহায়তার ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে হয়।

আলেয়া বলেন-আমি এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। আগের মতো কাজ করার শক্তি বা সামর্থ্য আর নেই। তাই নিজের কোনো আয়-রোজগারও নেই। জীবনের এই সময়ে আমার শিষ্যদের সহযোগিতার ওপরই নির্ভর করে চলতে হচ্ছে।

বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে  আলোচনা বাড়লেও বয়সের ভারে কর্মক্ষমতা হারানো হিজড়াদের জীবন নিয়ে খুব কমই কথা হয়। আয় কমে যাওয়ার পর তাদের জীবিকা, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের সংকট অনেক ক্ষেত্রেই অদৃশ্য থেকে যায়।

সিলেটের কয়েকজন প্রবীণ হিজড়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তরুণ বয়সে তারা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে আয় করলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সুযোগ কমে আসে। শারীরিক অসুস্থতা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে নতুন কাজ খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।

৫৫ বছর বয়সী মর্জিনা হিজড়া বলেন-আমরা সারা জীবন সমাজের নানা অবহেলা ও বৈষম্যের মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছি। ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও সমাজের স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। একসময় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও নবজাতকের বাসায় গিয়ে আশীর্বাদ করে যা আয় করতাম, তা দিয়ে কোনোমতে চলতে পারতাম। কিন্তু এখন বয়স বেড়েছে, শরীরও আর আগের মতো কাজ করে না। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত বাইরে যেতে পারি না। ফলে আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জীবনের এই সময়ে চিকিৎসা, খাবার ও বাসাভাড়ার খরচ জোগানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি সহায়তা পেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাই এখন অনেকটাই অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে দিন কাটাতে হচ্ছে। জীবনের শেষ বয়সে আমরা শুধু একটু নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ চাই।

৪৫ বছর বয়সী পাখি হিজড়া বলেন- একসময় প্রতিদিন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে কিংবা নবজাতকের বাসায় গিয়ে আশীর্বাদ করে আয় করতাম। তখন নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারতাম এবং অন্যের কাছে হাত পাততে হতো না। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় এখন আর আগের মতো নিয়মিত বাইরে যেতে পারি না। ফলে আয়-রোজগার অনেক কমে গেছে। অনেক দিন এমনও যায়, কোনো আয় হয় না। অথচ বাসাভাড়া, খাবার ও চিকিৎসার খরচ তো থেমে থাকে না। নিয়মিত ওষুধ কিনতে হয়, কিন্তু সবসময় সেই টাকা জোগাড় করতে পারি না। পরিবারের কাছ থেকেও তেমন কোনো সহযোগিতা পাই না। তাই অনেক সময় পরিচিতজন ও সম্প্রদায়ের অন্য সদস্যদের সহায়তার ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সবচেয়ে বড় চিন্তা হলো অসুস্থতা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা। আমরা চাই, রাষ্ট্র ও সমাজ আমাদের জন্য এমন কিছু ব্যবস্থা করুক, যাতে জীবনের শেষ বয়সে অন্তত সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকতে 

এ বিষয়ে সিলেটের তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে কাজ করে সংগঠন আশার আলোর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি মাহফুজ আলম বলেন- তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রবীণ সদস্যরা সবচেয়ে বেশি অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। কর্মক্ষম বয়সে বিভিন্নভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অধিকাংশেরই কোনো সঞ্চয় বা স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। অনেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় বার্ধক্যে এসে আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েন। অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ বহন করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। সরকারি ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আরও বেশি তৃতীয় লিঙ্গ ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। একটি মানবিক সমাজ গড়তে হলে তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রবীণ সদস্যদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরীন আক্তার বলেন- হিজড়া জনগোষ্ঠীও আমাদের সমাজেরই অংশ। একজন নাগরিক হিসেবে তাদেরও সমান অধিকার রয়েছে। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বয়স্ক ভাতা, চিকিৎসাসেবা ও অন্যান্য কল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তারা কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেকেই এসব সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানেন না বা কীভাবে আবেদন করতে হয় সে বিষয়ে সচেতন নন। আবার সরকারি সেবা পেতে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র লাগে, যা অনেক হিজড়া ব্যক্তির নেই। ফলে তারা নানা ধরনের সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহে সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন-তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রবীণ সদস্যরা সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। কারণ তাদের অনেকের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ নিয়মিত ও পরিকল্পিত নয়। স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং পুষ্টিকর খাদ্যের ঘাটতির কারণে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের শারীরিক সমস্যা দ্রুত বাড়ে। সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছরের পর শরীরে স্বাভাবিক ক্ষয় শুরু হয়, কিন্তু এ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে তা আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন-ফলে তারা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। আমার মতে, ৫০ বছর ঊর্ধ্বে সকল তৃতীয় লিঙ্গ ব্যক্তির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। তাদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্য কার্ড চালু করে অন্তত তিন মাস পরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে রোগ দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রমও জরুরি। সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন।

এ বিষয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (যুগ্মসচিব) মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন-সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠী ও হিজড়া সম্প্রদায়ের বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় রয়েছে। তারা কীভাবে আরও ভালোভাবে সরকারি ও স্থানীয় সহায়তার আওতায় আসতে পারে, সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। সারা দেশে তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও অধিকার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সিলেট সিটি কর্পোরেশনও তার অংশীদার।

তিনি বলেন-এই জনগোষ্ঠীর কেউ যদি সহযোগিতার জন্য আমাদের কাছে আসে, আমরা যথাসাধ্য সহায়তা করার চেষ্টা করি। ইতিমধ্যে অনেক তৃতীয় লিঙ্গ ব্যক্তি বিভিন্ন প্রয়োজনে আমাদের কাছে এসেছেন এবং আমরা আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী তাদের সহায়তা দিয়েছি। সমাজের পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও কল্যাণে সিটি কর্পোরেশন সবসময়ই সহানুভূতিশীল এবং ভবিষ্যতেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

এই সম্পর্কিত আরো