সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামের শত শত নারী ছাগল ও ভেড়া পালন করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। আয়ের বিকল্প উৎস হিসেবে ছাগল পালন বেছে নিয়ে তারা শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাচ্ছেন না, অন্য নারীদেরও উদ্বুদ্ধ করছেন।
প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা যায়, হাওর অধ্যুষিত জামালগঞ্জ উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রামে নারী উদ্যোক্তারা ছাগল ও ভেড়া পালন করছেন। উপজেলায় নিবন্ধিত ভেড়ার খামার রয়েছে প্রায় ১৫টি। ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার।
এছাড়া তালিকার বাইরে আরও কয়েক হাজার ছাগল ও ভেড়া রয়েছে। জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ কামলাবাজ গ্রামের বিধবা নারী নার্গিস আক্তার বলেন, আমার পরিবারে আয়ের কোনো উৎস ছিল না। তিন বছর আগে একজনের কাছ থেকে বাগি নিয়ে দুটি ছাগল কিনে পালন শুরু করি। সেই দুটি ছাগল থেকে এখন ২০টির বেশি হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি ছাগল বিক্রি করেছি। বর্তমানে ছয়টি রয়েছে। প্রতিটি ছাগল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। এই আয় দিয়েই আমার সংসার চলে।
তিনি আরও বলেন, ছাগল পালনে তেমন কোনো খরচ হয় না। সারাদিন গাছের লতাপাতা ও রাস্তার পাশের ঘাস খেয়ে এগুলো বড় হয়েছে। তবে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি আমাকে যেনো ছাগল ও ভেড়া রাখার জন্য একটি ঘর করে দেওয়া হয়।
সাচনা বাজার ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের মিনহা আক্তার বলেন, আমাদের আয়ের কোনো উৎস ছিল না। দুই বছর আগে দুটি ছাগল কিনেছিলাম। এখন তা বেড়ে ১৫টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ১২টি বিক্রি করেছি। প্রতি দুই-তিন মাস পরপর ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা দামে একটি করে ছাগল বিক্রি করেছি।
জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের ভুঁইয়ারহাটি গ্রামের নারী খামারি রেজিয়া খাতুন বলেন, আমার ভাই দুটি ছাগল কিনে দিয়েছিল। সেগুলো থেকে এখন ১২টি ছাগল হয়েছে। প্রতি দুই-তিন মাস পরপর দুই-তিনটি ছাগল বিক্রি করি। এতে বছরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা আয় হয়।
স্থানীয়রা জানান, হাওরাঞ্চলের অনেক নারী একসময় চরম কষ্টে জীবনযাপন করতেন। গত কয়েক বছরে ছাগল ও ভেড়া পালন করে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের দেশীয় ছাগল পালন করে অল্প পুঁজিতে ভালো লাভ পাচ্ছেন।
উপজেলার নয়াহালট গ্রামের ভেড়ার খামারের মালিক মহিবুল ইসলাম বলেন, ছাগলের দুধ সহজে হজম হয় এবং এর মাংস উন্নতমানের প্রাণিজ আমিষের উৎস। ভেড়ার মাংসেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই অনেক নারী আয়ের উৎস হিসেবে ছাগল ও ভেড়া পালন করছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. সামসুল হক বলেন, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ছাগল ও ভেড়া পালনের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে দরিদ্র নারীরা এ খাতে সফল হতে পারছেন। আমরা নিয়মিত খামার পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকি।
তিনি আরও বলেন, ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বছরে দুইবার বাচ্চা দেয় এবং প্রতিবার তিন থেকে চারটি পর্যন্ত বাচ্চা জন্ম দিতে পারে। ফলে অল্প সময়েই খামার সম্প্রসারণ সম্ভব হয়। এছাড়া হাওরাঞ্চলে প্রচুর ঘাস, ঝোপঝাড় ও লতাপাতা থাকায় ছাগল ও ভেড়ার খাদ্য ব্যয় খুবই কম।
তিনি জানান, সরকার গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পিপিআর রোগ নির্মূল ও খুরা রোগ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় ছাগল ও ভেড়ার জন্য বিনামূল্যে টিকা প্রদান করছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নিয়ে আরও বেশি নারী ছাগল ও ভেড়া পালন শুরু করলে তারা যেমন স্বাবলম্বী হবেন, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।