রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

শ্রীমঙ্গলে বালু লুটের মহোৎসব: নদী-ছড়া-রাস্তা, পরিবেশ বিপর্যয় ও জনদুর্ভোগ চরমে

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পাহাড়ী ছড়া, নদী ও কৃষিজমি থেকে অবাধে বালু উত্তোলন চলছে। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান, মামলা ও জরিমানার পরও থামছে না বালু খেকো চক্রের তৎপরতা। এতে একদিকে সরকার বছরে অন্তত ৬ থেকে ৭ কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ, কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।


সর্বশেষ  চার দিনের অভিযানে উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ১০হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত তিনটি মেশিনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।


উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকনের নেতৃত্বে শনিবার ১ হাজার ৫০০ ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ভূনবীর ইউনিয়নের তিনটি স্থানে অভিযানে পরিচালিত মোবাইল কোর্টে ৬ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়। একই সময়ে ভূনবীরের নতুন বাগান এলাকা থেকে আরও ২ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করা হয়।


প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১০ জনকে মোট ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সিন্দুরখান, ভূনবীর, মতিগঞ্জ, কালাপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে একাধিক  এক্সলেভেটর (ভেকু) মেশিন জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার ঘনফুট অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ ও বিনষ্ট করা হয়েছে।


বালুকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সংঘাত:
অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, হামলা, সড়ক দুর্ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। সম্প্রতি একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ির চাপায় ছয়জন আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয় জনতা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং শ্রীমঙ্গল-মির্জাপুর সড়ক অবরোধ করে।


শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত রবিবার র্যা ব, বিজিবি, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানের সময় একটি বালুবাহী ডায়না গাড়ি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ব্যাটারিচালিত টমটমকে চাপা দেয়। এতে চালকসহ ছয়জন আহত হন। আহতরা হলেন শিপন মিয়া (২৫), রাসেল (২১), গিয়াস মিয়া (২৪), রুবেল মিয়া (৩৫), জাকির মিয়া (১৭) ও মারজান আহমেদ (১৮)।


ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা ডায়না গাড়িটি ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং সড়কে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। ফলে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, র্যা ব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।


এ ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরাও হামলার শিকার হন। দুর্বৃত্তরা একুশে টেলিভিশনের একটি সানগান ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।


২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
গত ২ মে ভূনবীর ও মির্জাপুর এলাকায় পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন ভূনবীর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিমেল পাল।

মামলার আসামিরা হলেন- ফেরদৌস মিয়া, আহাদ মিয়া (১), আহাদ মিয়া (২), কাওছার মিয়া, উজ্জ্বল মিয়া, ফয়েজ মিয়া, মোচ্ছাব্বির মিয়া, মাসুক মিয়া, লোকমান মিয়া, মো. আব্দুল্লাহ, মকবুল মিয়া, কদর আলী, নানু মিয়া, দুদু মিয়া, সামছু মিয়া, বেলাল মিয়া, আছলম মিয়া, কবির মোল্লা, লতিফ মিয়া ও আজাদ মিয়া। তাদের অধিকাংশের বাড়ি ভুনবীর ও মির্জাপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে।


মামলায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ছড়া ও কৃষিজমি সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি, বসতভিটা ও স্থানীয় অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে পড়ছে।


৩০টির বেশি পাহাড়ি ছড়া ঝুঁকিতে
শ্রীমঙ্গলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৩০টিরও বেশি পাহাড়ি ছড়া হাইল হাওরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বর্মাছড়া, উদনাছড়া, হরিণছড়া, পুটিয়াছড়া, বিলাশছড়া, ফুলছড়া, কাকিয়াছড়া, আমরাইলছড়া, ইছামতিছড়া, ভুড়ভুড়িয়া ছড়া, জাগছড়া, সুনাছড়া, নারাইনছড়া, বৌলাছড়া, গিলাছড়া, শিয়ালছড়া, খাইছড়া ও শাখামোড়া ছড়া।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিন্দুরখান ইউনিয়নের লাংলিয়া ছড়া, সিন্দুরখান চা-বাগান, কুঞ্জবন, কামারগাঁও ও চিরিগাঁও এলাকায় একাধিক পয়েন্ট থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। একই ইউনিয়েনের মটুলির পাড় এলাকায় বিটন কুর্মীর বাড়ি পাশে একটি চক্র পুটিয়া ছড়া থেকে বালু উত্তোলণ করে।


আশিদ্রোন ইউনিয়নের বিলাশ নদীর  পাড়ের টং , আশিদ্রোন ও জামসী এলাকা, সাতগাঁও ইউনিয়নের মাকরী ছড়া, গান্ধিছড়া ও ইছামতিছড়া, ভুনবীর ইউনিয়নের জয়িতাছড়া এবং মির্জাপুর ইউনিয়নের বড়ছড়া ও বৌলাছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কালাপুর ইউনিয়নের শিয়ালছড়া, নারাইনছড়া ও জাগছড়ার একাধিক স্থান থেকেও নিয়মিত বালু উত্তোলন হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এছাড়াও শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন, কালিঘাট ও রাজঘাট ইউনিয়নেরও বেশ কিছু জায়গা থেকে ছোট ছোট পরিসরে বালু উত্তোলণের অভিযোগ রয়েছে।

কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে মোট ২৬টি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে শুধু বিলাসছড়া লিজের আওতায় রয়েছে। আইনগত জটিলতার কারণে বাকি মহালগুলো দীর্ঘদিন ধরে লিজ দেওয়া সম্ভব হয়নি।


বর্তমানে ব্যবসায়ী মো. সেলিম মিয়া বছরে ৬৫ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে বিলাশছড়ার ইজারা নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সব বালুমহাল লিজের আওতায় আনা গেলে সরকার বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারত।


পরিসংখ্যান বলছে, লিজবিহীন ছড়াগুলো থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বালু অবৈধভাবে উত্তোলন হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবেশগত ক্ষতি, পাহাড়ি ছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, কৃষিজমির ক্ষয় এবং গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।


এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গলে বালু মহালের একমাত্র লিজ গ্রহিতা সেলিম মিয়া জানান, বছরে ৬৫ লক্ষ টাকা লিজ মানি দিয়ে তিনি বিলাশ ছড়া  লিজ এনেছেন। কিন্তু একটি অবৈধ চক্র তার এলাকা থেকেও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন করে।  এ ব্যাপারে তিনি হায়দর গং এর নামে  প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছেন। 
 
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মহিবুল্লাহ আকন বলেন,  অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক মাসে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা, বালু জব্দ ও মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় থানায় একাধিক নিয়মিত মামলা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও জনগণের সহযোগিতায় ভারী যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করা হয়েছে।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, আইনগত জটিলতার কারণে সব ছড়া লিজের আওতায় না থাকলেও কেউ যাতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।


এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে । সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব  থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।  এখন এটি চলবে না। প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দলমত নির্বিশেষে যে-ই বালু তুলবে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য।

তিনি বলেন এলাকাবাসীর কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে প্রশাসনের সাথে আমি নিজেও অভিযানে গিয়েছি। কৃষি জমির মাটি কেটে যেভাবে পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে তা আমি নিজ চোখে দেখে এসেছি। এটি বন্ধে আমরা প্রশাসনকে আরো উদ্যোগী ভূমিকা নিতে বলেছি।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সব বালুমহালকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় পরিবেশ ধ্বংস, কৃষিজমির ক্ষতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

এই সম্পর্কিত আরো