মৌলভীবাজারের হাওর অধ্যুষিত অঞ্চলে আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত সকল প্রকার মাছ ধরা ও মাছ ধরার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দেশের মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাছের উৎপাদন টেকসই রাখতে এমন সিদ্ধান্তের কোনো বিকল্প নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে জারি হওয়া এই নিষেধাজ্ঞা মাঠপর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে?
বাস্তব চিত্র বলছে, জেলার বিভিন্ন হাওর ও বিলে এখনো অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ ম্যাজিক জাল, কারেন্ট জাল এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বাহাবী’ জাল। এসব জালের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ ও মাছের পোনা নিধন করা হচ্ছে, যা মৎস্য সম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকি। অথচ এ দৃশ্য যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখেই পড়ে না। ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—নিষেধাজ্ঞা কি শুধু আইনগত ঘোষণা, নাকি এর বাস্তব প্রয়োগও আছে?
প্রায়ই দেখা যায়, অবৈধ মাছ ধরার বিষয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর তথ্য-প্রমাণ চায়। আবার তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে শোনা যায় জনবল সংকট, যানবাহনের অভাব কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা। কিন্তু জনবল সংকট কোনোভাবেই আইনের প্রয়োগে দীর্ঘস্থায়ী অজুহাত হতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রীয় আইন বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই।
মৎস্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব শুধু অফিসকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা নয়; মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, অভিযান পরিচালনা এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করাও তাদের কর্তব্য। হাওরে যদি নিষিদ্ধ জালের বিস্তার ঘটে এবং প্রকাশ্যে মাছ শিকার চলতে থাকে, তবে নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মৎস্য সম্পদ রক্ষায় কেবল সচেতনতামূলক প্রচারণা নয়, প্রয়োজন কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান। প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং মৎস্য বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ জাল উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা জরুরি।
হাওর আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, স্থানীয় জনগণেরও। তবে আইন বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই। নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন হাওরের প্রতিটি বিলে তার কার্যকর প্রতিফলন দেখা যাবে। অন্যথায় কঠোর আইনও কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, আর হাওরের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়বে।