সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা-এর বিভিন্ন ছোট-বড় হাটবাজারে ঈদুল আজহার কেনাকাটার ধুম থাকার কথা থাকলেও এবার তেমন কোনো উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে কোরবানির পশুর হাট ও কাপড়ের দোকানগুলোতে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বেচাকেনা অনেক কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তাদের দাবি, চলতি বোরো মৌসুমে ভারি বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রধান বোরো ফসল কাটতে পারেননি কৃষকরা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বর্গাচাষিরা। ফলে তাদের হাতে টাকা না থাকায় ঈদের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
উপজেলার প্রধান ফসল বোরো ধান বিক্রি করে কৃষক ও বর্গাচাষিরা সাধারণত কোরবানির পশু কেনা, নতুন জামাকাপড়, মসলা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করে থাকেন। কিন্তু এবার আগাম বৃষ্টিতে হাওরের এক-চতুর্থাংশ ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক ও বর্গাচাষি পরিবারের ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে প্রান্তিক বর্গাচাষির সংখ্যা ১০ হাজার ৬৫ জন, ক্ষুদ্র বর্গাচাষি ১৩ হাজার ৪১৮ জন এবং ভূমিহীন পরিবার রয়েছে ৪ হাজার ৩৪৭টি।
উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের কৃষক মুসলিম উদ্দিন বলেন, প্রতি বিঘা ৮ হাজার টাকা হিসেবে ৭ বিঘা জমি ৫৬ হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে চাষ করেছিলাম। এর মধ্যে শ্রমিকের মজুরি দিয়ে তিন বিঘা জমির ধান কাটতে পেরেছি। বাকি চার বিঘা জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তিন বিঘার ধান কাটলেও শ্রমিক ও নৌকা ভাড়া দিয়ে কিছুই রইল না। এখন সারা বছর কীভাবে সংসার চালাব, ছেলে-মেয়েদের ঈদের কাপড়ই বা কীভাবে কিনে দেব বুঝতে পারছি না। সংসারে যেন অন্ধকার নেমে এসেছে।
সাচনা বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, এবার কাপড় বিক্রি অনেক কম। সাধারণত ঈদের আগে এই সময়ে দোকানে ক্রেতাদের প্রচুর ভিড় থাকে। কিন্তু এবার মানুষের হাতে টাকা না থাকায় বিক্রি ভালো হচ্ছে না, অথচ ঈদের আর মাত্র তিনদিন বাকি।
সাচনা বাজারের মনিহারি ব্যবসায়ী কিবরিয়া বলেন,কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে মসলা, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন পণ্যের বিক্রি কিছুটা বাড়লেও আগের বছরের মতো ক্রেতাদের আগ্রহ নেই। সবাই খুব হিসাব করে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনছেন, বাড়তি কিছু কিনতে চাইছেন না।
এদিকে পশুর হাট ঘুরে জানা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর দামও বেশি। গরু ও ছাগলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা এখনো পশু কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গরুর খাবার ও লালন-পালনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় পশুর দামও বেড়েছে।
কিশোর আব্দুর রহিম সানাউল্লাহ বলেন, এবার মেঘের পানিতে সব ধান তলিয়ে গেছে। তাই মা-বাবা আমাদের নতুন জামাকাপড় কিনে দিতে পারছেন না। নতুন জামা ছাড়া এবার ঈদ করতে হবে।
বেহেলি ইউনিয়নের বর্গাচাষি সালাম আব্দুল্লাহ ফজর আলী বলেন, আমরা অনেকে ৬ থেকে ১০ বিঘা জমি প্রতি বিঘা ৮ হাজার টাকায় বর্গা নিয়ে চাষ করেছি। চাষাবাদে এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করেছিলাম ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। কিন্তু উল্টো সর্বনাশ হয়েছে। ঈদ চলে এসেছে, অথচ সন্তানদের জন্য কিছুই কিনতে পারিনি। এবার আমাদের ঈদ শেষ।
স্থানীয়দের মতে, কৃষিনির্ভর জামালগঞ্জ উপজেলা-এর অর্থনীতিতে বোরো ফসলের বড় ভূমিকা রয়েছে। বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বড় কৃষকদের কিছুটা ক্ষতি হলেও বর্গাচাষিরা একেবারেই পথে বসেছেন। এর প্রভাব শুধু কৃষক পরিবারেই নয়, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়েছে। বাজারে বেচাকেনা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে। ফলে ঈদুল আজহা সামনে থাকলেও উপজেলার অনেক পরিবার, বিশেষ করে বর্গাচাষি পরিবারগুলো আনন্দের বদলে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মিনহাজুল ইসলাম বলেন, এবার হাওরের ফসল অনেকাংশে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষক ও বর্গাচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আলোকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে কৃষি প্রণোদনার জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজার ১০৩ জন এই তালিকার আওতায় এসেছেন। প্রতিজনকে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি চাল দ্রুত বিতরণ করা হবে। কৃষি প্রণোদনার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন।