সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে জলাবদ্ধ হাওরাঞ্চলে ধান আনতে ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা। হাওরের উঁচু-নিচু রাস্তায় কোথাও অল্প পানি, আবার কোথাও কাদাযুক্ত রাস্তা—এই পরিস্থিতিতে এখন ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র বাহন হিসেবে ব্যবহার করছেন কৃষকেরা। এই গাড়ি দিয়ে হাওরের কাটা ধান মাড়াই করে বস্তাভর্তি ধান আনা-নেওয়া করছেন তারা। শুধু ধান পরিবহনই নয়, নির্দিষ্ট গন্তব্যে শ্রমিক ও কৃষকের যাতায়াতেও ব্যবহৃত হচ্ছে এই বাহন। ফলে হাওরাঞ্চলের অনেক গাড়িচালকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
হাওরের কাঁচা-পাকা রাস্তার কোথাও পানি, কোথাও আধাপাকা পথ—এ কারণে অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। তাই প্রতিদিন ঘোড়ার গাড়িচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কৃষকেরা। কালের বিবর্তনে রাজকীয় বাহন ঘোড়ার গাড়ির রূপ বদলালেও এর প্রয়োজন এখনো ফুরায়নি। জামালগঞ্জের হাওরাঞ্চলে মালামাল নিয়ে ছুটে চলে ঘোড়ার গাড়ি। সভ্যতার এই যুগে হাওরের মানুষের গরু কিংবা মহিষের গাড়ি এখন আর চোখে পড়ে না। হাওরের ডুবে যাওয়া বোরো ধান শ্রমিকেরা কেটে নৌকায় করে জাঙ্গালে নিয়ে আসে। সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে গন্তব্যস্থানে কাটা ধান বহন করা হয়। এছাড়া মানুষের যাতায়াত ও অন্যান্য মালামাল পরিবহনেও কোথাও কোথাও ব্যবহার করা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি।
ঘোড়ার গাড়ির মালিক ভীমখালী ইউনিয়নের গুচ্ছ গ্রামের রুস্তম আলীর ছেলে আব্দুল আলী বলেন, ঘোড়ার গাড়ি চালিয়েই জীবিকা নির্বাহ করি। এতে প্রতিদিন দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা আয় হয়। এই আয় দিয়ে ঘোড়ার খাবার, ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাই।
আরেক ঘোড়ার গাড়িচালক ছেলাইয়া-মাহমুদপুর গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে লোকমান হোসেন বলেন, হাওরের কর্দমাক্ত উঁচু-নিচু রাস্তায় ধান আনার কাজে ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় রোগীকে হাসপাতালে নিতে সমস্যা হয়, তখন জরুরি প্রয়োজনে বিছানাপত্রসহ রোগীকে ঘোড়ার গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যাই।
তিনি আরও জানান, মাইক্রোবাসের পুরোনো চাকা দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি তৈরি করা হয়। প্রতিটি গাড়ি তৈরি করতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয় এবং একটি ঘোড়া কিনতে লাগে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। সাধারণত দিনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় হলেও বর্তমানে জলাবদ্ধতার কারণে নৌকা ও ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আয় বেড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
কৃষক আহমদ আলী বলেন, ১০-১৫ বছর আগেও হাওর থেকে ধান আনতে গরু বা মহিষের গাড়ি ব্যবহার করা হতো। এখন ইঞ্জিনচালিত হ্যান্ডট্রলি ও ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। তবে হ্যান্ডট্রলি অনেক জায়গায় আটকে যায়, তাই ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার বেশি হচ্ছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এই উপজেলায় গাড়ির সংখ্যা কম। ফলে অন্য উপজেলা থেকে ভাড়া করে আনতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, হাওরবাসীর কষ্টে উৎপাদিত বোরো ধান, ভুট্টা, টমেটো, মরিচ, আলু, বাদামসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য হাওর থেকে গ্রামে আনতে অনেক কষ্ট হয়। এই কষ্ট লাঘবে এখন ঘোড়ার গাড়িই ভরসাস্থল।
শিক্ষক আবুল লেইস বলেন, একসময় কৃষকের ঘরে ঘরে গরু কিংবা মহিষ থাকত, এবং কাঠের চাকা দিয়ে গাড়ি তৈরি করে ধানসহ মানুষ পরিবহন করা হতো। কিন্তু এখন ইঞ্জিনচালিত হ্যান্ডট্রলি ও অটোরিকশা চালু হলেও জলাবদ্ধতার কারণে এগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই এই সময়ে ঘোড়ার গাড়ি আবার জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভীমখালী ইউপি চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান তালুকদার বলেন, হাওরের নিম্নাঞ্চল, জলাবদ্ধতা, রাস্তায় খানাখন্দ ও কর্দমাক্ত অবস্থার কারণে অন্য যানবাহন চলতে পারে না। তাই কৃষকেরা ঘোড়ার গাড়িকে জনপ্রিয় বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এতে একদিকে কৃষকের উপকার হচ্ছে, অন্যদিকে চালকেরাও লাভবান হচ্ছেন।