সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলায় টানা কয়েক দিনের রোদে প্রাণ ফিরেছে হাওরের কৃষকদের মাঝে। অতিবৃষ্টির জলাবদ্ধতায় অনেক কৃষক তড়িঘড়ি করে ধান কাটলেও তা ঠিকমতো শুকাতে পারেননি। ফলে কষ্টার্জিত ধানে অঙ্কুর গজিয়ে শতাধিক কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে।
গত বুধবার থেকে টানা রোদ থাকায় খলায় জমানো কাটা ধান শুকিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। কোথাও কোথাও হারভেস্টার মেশিন দিয়ে আবারও ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষকেরা। খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও শ্রমিক সংকটের কারণে অনেক কৃষক হারভেস্টার ব্যবহারে স্বস্তি পেয়েছেন।
হাওরে এখন বৈশাখের চিরচেনা কর্মব্যস্ত রূপ ফিরে এসেছে।
সোমবার দুপুরে জামালগঞ্জ থেকে বেহেলী বদরপুর গ্রামের পাশের এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। কথা হয় কৃষক সুধাংশু রঞ্জন পালের সঙ্গে। তিনি জানান, “যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। ফসল তলিয়ে যে ক্ষতি হয়েছে, তা আর পুষিয়ে নেওয়া যাবে না। এখন যেটুকু ধান আছে, বাড়ির নারী-পুরুষ সবাই মিলে তা ঘরে তোলার চেষ্টা করছি। ২২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। এর মধ্যে ৮ বিঘার ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি ধান খলায় এনেছি। এখন মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত আছি। আর যদি এক সপ্তাহ এমন রোদ থাকে, তাহলে হালির হাওরের ধান কাটা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, “এক সপ্তাহ আগে যদি এমন রোদ থাকত, তাহলে কৃষকদের এত ক্ষতি হতো না। তবে গত পাঁচ দিনের রোদে কৃষকদের মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।”
লম্বাবাক গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “৮০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। এর মধ্যে ২০ বিঘার ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। বাকি জমির ধান শ্রমিক দিয়ে কাটাচ্ছি। গত কয়েক বছর ভালো ফলন পেলেও এবার অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় আমার মতো অনেক কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। যারা ৮-১০ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন, তারা একেবারে সর্বস্বান্ত। আর যারা ধারদেনা করে বর্গা জমিতে চাষ করেছেন, তারা সব হারিয়ে পথে বসেছেন। আমাদের মতো বড় কৃষকদেরও এখন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে টিকে থাকতে হচ্ছে। তবে কয়েক দিনের রোদে কৃষকেরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।”
সাচনা গ্রামের কৃষক সুকেশ পাল বলেন, “ছয় দিন পর ধান কাটতে এলাম। পাঁচ দিন আগেও এই জমি পানিতে তলিয়ে ছিল। পানি কমে যাওয়ায় এখন ধান কাটছি। আরও কয়েক দিন রোদ থাকলে ধান কাটা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।”
শাহাপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন বলেন, “চার একর জমিতে স্কিমের মাধ্যমে চাষ করেছিলাম। গত রবিবার হারভেস্টার মেশিন দিয়ে প্রতি কেয়ার দুই হাজার টাকা করে ধান কেটেছি।”
পাকনার হাওরের ডিমখালী ইউনিয়নের ছেলাইয়া গ্রামের কৃষক তারা মিয়া তালুকদার জানান, “আমি ১০ একর জমিতে বোরো ধান চাষ করেছি। গত রবিবার প্রতি কেয়ার দুই হাজার টাকা করে ধান কেটেছি। কয়েক দিনের রোদে জমির পানি শুকিয়ে যাওয়ায় হারভেস্টার মেশিন নামানো সম্ভব হয়েছে। এখন ধান শুকিয়ে গোলায় তোলার কাজ চলছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা বলেন, “টানা কয়েক দিনের রোদে কৃষকেরা স্বস্তি পেয়েছেন। মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করছেন। রোদের কারণে হাওরের অনেক কৃষক হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা শুরু করেছেন। এভাবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে ধান কাটা প্রায় শেষ হয়ে যাবে।