সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা-এ দিন দিন বাড়ছে গবাদিপশুর খামার। একসময় যেখানে খামারভিত্তিক পশুপালন ছিল সীমিত, সেখানে এখন গ্রামাঞ্চল, হাওর এলাকা ও বাড়ির নির্ধারিত স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় খামার। ফলে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।
২০১৪ সালে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ার পর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো জামালগঞ্জেও বাণিজ্যিক গবাদিপশুর খামার বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে উপজেলার অনেক উদ্যোক্তা এই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছেন। বাজারে গরুর মাংসের চাহিদা, সামাজিক অনুষ্ঠান ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে কোরবানির বিশাল বাজার এবং দুধের বাড়তি চাহিদা খামার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, জামালগঞ্জে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫৫টি গবাদিপশুর খামার রয়েছে। এসব খামারে প্রায় ১ হাজার ৫৮টি গরু পালন করা হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
একসময় কৃষকের ঘরে ঘরে গরু-মহিষ পালন ছিল সাধারণ বিষয়। হাওরজুড়ে ছিল পশুচারণের বিস্তীর্ণ পতিত জমি। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমির সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং চাষাবাদের পরিবর্তনের কারণে আগের মতো গবাদিপশু পালন কমে গেছে। ফলে এখন কোরবানি ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাংসের চাহিদা পূরণে খামারিদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সরেজমিনে উপজেলার সদর ইউনিয়নের নতুনপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, খামারি মোহাম্মদ নজির হোসেন-এর খামারে বর্তমানে ১৬টি গরু রয়েছে। এর আগে কোরবানির জন্য তিনি দুটি গরু বিক্রি করেছেন। এবার ঈদে আরও চারটি গরু বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। বাকি গাভীগুলো রাখা হবে দুধ উৎপাদনের জন্য।
তিনি জানান, তার খামারের পিজিয়ান ও শাহীওয়াল জাতের প্রতিটি গরুতে ১৮ থেকে ২০ মণ পর্যন্ত মাংস হবে। গরুর খাদ্যের জন্য তিনি ৮ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেছেন। খামারে একজন শ্রমিক মাসিক ২০ হাজার টাকা বেতনে কাজ করছেন।
নজির হোসেন বলেন, “প্রতিটি গরু কোরবানির ঈদে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি হবে। জামালগঞ্জে এত বড় গরুর ক্রেতা কম থাকায় সিলেট কিংবা সুনামগঞ্জ শহরে নিয়ে বিক্রি করতে হয়। এছাড়া প্রতিদিন প্রায় ৫০ লিটার দুধ বিক্রি করছি। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা লাভ হয়।”
সদর ইউনিয়নের সংবাদপুর গ্রামের আব্রাম অ্যান্ড আবির ডেইরি ফার্ম-এর মালিক বদরুল হাসান বাদশা জানান, তার খামারে বর্তমানে ৩৪টি গরু রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি গাভী ও ৫টি বাছুর রয়েছে। এবার কোরবানির ঈদে চারটি গরু প্রায় ৯ লাখ টাকায় বিক্রির আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, “প্রতিটি গরুর ওজন প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ কেজি হবে। এখন অনেকেই হাটে গিয়ে গরু কেনার ঝামেলা এড়িয়ে সরাসরি খামার থেকে গরু কিনে নিয়ে যান। ঘাস, খাবার ও শ্রমিকের খরচ বাদ দিয়েও প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকার বেশি আয় হয়। এছাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সহায়তায় সরকারিভাবে আমার খামারে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে।”
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গবাদিপশুর খামার এখন গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। খামারিদের প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও পরামর্শসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে খামার ব্যবস্থাপনা করলে এ খাত থেকে আরও বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব বলেও তারা উল্লেখ করেন।