জামালগঞ্জের বিভিন্ন হাওর দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা থাকলেও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে অর্থের অপচয়সহ প্রকৃতির সাথে না পেরে ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছে না হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা। ফলে মাঠের ধান মাঠেই নষ্ট হয়ে গেছে। যার কারণে জামালগঞ্জ উপজেলার পাকনা, মিনি পাকনা, হালি, মহালিয়া, সনোয়ার হাওরসহ ছোট-বড় হাওর এলাকার কৃষকেরা পড়েছে চরম বিপাকে। এই ২৪ হাজার ৫ শত ৫ হেক্টর জমিতে বোর আবাদ করেছে কৃষকেরা। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ধান পেকে গেলেও কাটতে পারছে না কৃষকেরা।
জানা যায়, ৬ টি ইউনিয়নের নিম্ন এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সেই পানি নিষ্কাশনের জন্য শতাধিক পাম্প মেশিন লাগিয়েও পানি নিষ্কাশন করা যায়নি। পানি নিষ্কাশনে যে পরিমাণ পানি একদিনে নদীতে পড়ে প্রতিদিনের বৃষ্টিতে প্রায় ১০ গুন বৃদ্ধি পায়। এরইমাঝে কৃষকেরা আগাম বন্যার সম্ভাবনা থাকার সরকারি নির্দেশনা পেয়ে ধান কাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
শ্রমিক সংকট, হারবেস্টার মেশিন না চলায় নিজেরাই সার্মথ্য অনুযায়ী ধান কাটতে শুরু করেন। টানা বৃষ্টি সাথে বজ্রপাত ও হাওর থেকে ফসল খলায় আনতে কাঁচা রাস্তাগুলো পানিতে নিমজ্জিত ও কর্দমাক্ত হওয়ায় কাটা ধান আনতে পারছে না কৃষকেরা। এছাড়াও ডুবে যাওয়া ধান কাটতে এবং সেই ধান কৃষকের বাড়ি পর্যন্ত আনতে কোন শ্রমিক অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়েও করতে চাচ্ছে না। যার কারণে পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। তাই আশপাশের জমির ধান কাটতে পারলেও হাওরের হাজার একরের ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের চোখের সামনেই।
নাজিমনগর গ্রামের কৃষক আজিম উদ্দিন জানান, ৮ বিঘা জমিতে বোর ধান চাষ করেছি। ধানের ফলন খুব ভাল হয়েছে। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ধান পানিতে ডুবে আছে। প্রতিদিন ভাবি পানি কিছুটা কমলে ধান কাটবো। কিন্তু ফল হয়েছে উল্টো। টানা ২ দিনের বৃষ্টিতে ৮ বিঘা জমির ফসল সবটাই তলিয়ে গেছে। এখন আশা ছেড়ে দিয়েছি। সারা বছর ছেলে মেয়ে নিয়ে কিভাবে সংসার চালাবো ভেবে পাচ্ছিনা।
সাচনা বাজার ইউনিয়নের খলা চানপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা গয়াচান সরকার বলেন, ২০ বিঘা জমিতে বোর ধান চাষ করেছিলাম। ১০ জন শ্রমিক প্রতিদিন ১ হাজার টাকা মজুরিতে ৮ বিঘা জমির ধান কেটেছি। বাকি ধান কাটার জন্য শ্রমিকদের ৩ দিন রেখে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা এবং বজ্রপাতের কারণে ধান কাটতে পারি নাই। যার কারণে শ্রমিকদের বিদায় করে দিয়েছি। আজ বাকি জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে।
হালির হাওরের আছানপুর গ্রামের কৃষক মোঃ নজির আহমদ জানান, আছানপুর গ্রামের কৃষকের খলায় কাটা ধান হাটু পানিতে তলিয়ে গেছে। অতিবৃষ্টির কারণে হাওরে জলাবদ্ধতা হওয়ায় হাওরে ধান কাটা যাচ্ছে না। যার কারণে অনেক কৃষক ধান কাটার শ্রমিক না পেয়ে ধানের আশা ছেড়ে দিয়েছেন। কৃষকেরা ধান কেটেও লাভ নাই। ধান শুকানোর খলা ডুবে গেছে। আর যে পরিমাণ কাটার খরচ হয়, তা ধানের চেয়ে অনেক গুন বেশি। যার কারণে কৃষকেরা হতভম্ব হয়ে পড়েছে।
পাকনার হাওরের রাজাপুর গ্রামের কৃষক রাবণ দাস বলেন, অতিবৃষ্টির কারণে পাকনার হাওরের দোলতা নদীর দুইপাড়ের ফসল বেশর ভাগ তলিয়ে গেছে। শ্রমিক না পেয়ে যার যার সার্মথ্য অনুযায়ী ধান কাটে কেহ নৌকায় কেহ পনিথিনের ত্রিপালে করে টেনে নিয়ে আসছে।
ভীমখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ আখতারুজ্জামান তালুকদার জানান, ভান্ডা-মল্লিকপুর হাওরের প্রায় ৬০ ভাগ ফসল তলিয়ে গেছে। এদিকে দিগার হাওর ও কোরালিয়া হাওরে প্রায় ৩০ ভাগ ফসল জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে। অন্য যেসব হাওর এখনো রয়েছে এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে ৩/৪ দিনের মধ্যে তলিয়ে যেতে পারে। হাওরের সব ধান পেকে গেছে, কিন্তু আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকেরা ধান কাটতে পারছে না।
সাচনা বাজার ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ মাসুক মিয়া জানান, সনোয়ার হাওর, লামার ভুই, ডাকুয়ার হাওর জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে। রওয়ার হাওরের প্রায় অর্ধেক জমি তলিয়ে গেছে। ভুরি ডাকুয়া ও জোয়াল ভাঙ্গা হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে। অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে মাত্র ২০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। যেগুলো কাটা হয়েছে সেগুলো দিন ভাল না থাকায় খলায় ধানের চারা এসে পড়েছে। এভাবে বৃষ্টি চলমান থাকলে ২/৩ দিনের মধ্যেই সব হাওর তলিয়ে যাবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন কুমার সাহা জানান, আমাদের হাওরে ২৪ হাজার ৫ শত ৫ হেক্টর জমিতে বোর আবাদ করা হয়েছে। আজকে পর্যন্ত কর্তন হয়েছে ১০ হাজার ২৬ হেক্টর জমির ধান। গত ২ দিনের বৃষ্টিতে আরো ১ শত হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। যদি বৃষ্টি চলমান থাকে তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে। জমিতে জলাবদ্ধতা থাকায় হারভেস্টার মেশিন চালাতে পারছে না। আবার বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কৃষক ও শ্রমিক জমিতে যেতে ভয় পাচ্ছেন। আপাতত কৃষকদের আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে সাধ্যমতো দ্রুত ধান কর্তনের জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।