সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা জুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাদকদ্রব্যের বিস্তার। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে গ্রামের হাট-বাজার ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও সহজেই মিলছে গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য। ফলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত প্রায় দেড় বছর ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা তুলনামূলক কমে যাওয়ার সুযোগে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এখন প্রকাশ্যেই চলছে মাদকের বেচাকেনা। এর প্রভাবে মাদকের কড়ালগ্রাসে আসক্ত হয়ে পড়ছে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত পর্যন্ত নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ তালিকায় রয়েছে উঠতি বয়সের তরুণ সমাজ, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় জামালগঞ্জে গাঁজা ও মদের ব্যবসা সীমিত আকারে এবং গোপনে পরিচালিত হতো। কিন্তু বর্তমানে গাঁজা ও মদের পাশাপাশি মরণনেশা ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা প্রকাশ্যেই চলছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যবসার সঙ্গে প্রভাবশালী পরিবারের কিছু তরুণও জড়িয়ে পড়ছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ে স্থানীয় বাসিন্দারাও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার সচেতন মহলের মতে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগের বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সের তরুণদের মধ্যে মাদকসেবনের প্রবণতা বাড়ায় অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
উপজেলা সদর, সাচনা বাজার, বেহেলী বাজার, মন্নানঘাট বাজার, গজারিয়া বাজার, রামনগর বাজার, নোয়াগাঁও বাজার, লক্ষীপুর বাজার ও আটগাঁও লালবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দোকান ও আড্ডাস্থল ঘিরে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকে করে ভ্রাম্যমাণভাবে মাদক সরবরাহ করতে দেখা যায় অনেককে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের একাধিক স্পটেও মাদক ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব মাদক বিক্রি ও সেবন হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা। সচেতন মহলের মতে, জামালগঞ্জে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে এবং এ ব্যবসায় আরও অনেকের অর্থ বিনিয়োগ রয়েছে।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রবসহ কয়েকজন সমাজসেবী ও গণ্যমান্য ব্যক্তি বলেন, মাদকের ভয়াল থাবায় ধ্বংস হচ্ছে তরুণ সমাজ। অনেক ক্ষেত্রে উঠতি বয়সের যুবকদের হাতে মাদক তুলে দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। এমনকি অনেক পরিবারের সামনে সন্তানদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, উপজেলার যুবসমাজের একটি বড় অংশ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গ্রামগঞ্জে মসজিদ-মন্দিরেও চুরির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক সময় প্রশাসনের অভিযানে মাদক ব্যবসায়ীরা গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁকফোকরে বের হয়ে আবার একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে। তাই মুখ দেখে নয়, প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ থানা-র অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. বন্দে আলী বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমরা আগেও সোচ্চার ছিলাম, এখনও আছি। প্রতিনিয়ত মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে জামালগঞ্জ থানা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে।” পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও সচেতন মহলকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।