শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কান্নার বিদায়—বালাগঞ্জে শিক্ষকের ব্যতিক্রমী সংবর্ধনা

শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এটি এক মহান ব্রত—এই সত্যেরই জীবন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বোয়ালজুড় শাহ মকসুদ শাহ মনির উদ্দিন (রহ.) হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত সুপার মাওলানা মো. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। দীর্ঘ প্রায় ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানার দিনে বালাগঞ্জে তাকে দেওয়া হলো এক ব্যতিক্রমধর্মী ও রাজকীয় সংবর্ধনা। আবেগঘন এই বিদায় অনুষ্ঠানে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও এলাকাবাসী।

১৯৬৪ সালে মাত্র ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা ঐতিহ্যবাহী এ মাদরাসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর নাম। সততা, নিষ্ঠা ও আদর্শিক নেতৃত্বে তিনি হয়ে উঠেছিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে এক শ্রদ্ধার প্রতীক। তাঁর অবসর উপলক্ষে এবং মাদরাসার ৬০ বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী ও বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই অধিবেশনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের সভাপতি মিজানুর রহমান খালিছাদার ও মাদরাসার এডহক কমিটির সভাপতি কামরুল হুদা জায়গীরদার।

প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জুয়েল আহমদ লতিফি ও মো. মিজানুর রহমানের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসার সাবেক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা নজমুদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী।

প্রধান অতিথি তার বক্তব্যে বলেন, মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী আমারই ছাত্র। তিনি শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই সততা ও নিষ্ঠার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ এলাকার মানুষ আজ যে ভালোবাসা ও সম্মান দেখিয়েছেন, তা সত্যিই গর্বের। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য দেশপ্রেম ও মানবিকতা গড়ে তোলা। যে কাজই করি না কেন, তা ভালোবাসা, মেধা ও মনন দিয়ে করতে হবে।

সংবর্ধিত অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মো. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী আবেগাপ্লুত হয়ে আয়োজক ও এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি সবার কাছে দোয়া চান এবং তাঁর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত নামাজ আদায় ও সৎ জীবনযাপনের আহ্বান জানান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ওসমানীনগরের মাদার বাজার ফয়জুল উলুম হাফিজিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. সৈয়দ শহিদ আহমদ বোগদাদি, বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মুনিম, ইসলামিয়া মোহাম্মদিয়া আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার, মুসলিমাবাদ মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কুহিনুর উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।

অনুষ্ঠানে সংবর্ধিত শিক্ষকের পুত্র নাইমুল হাসান চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তব্য দেন সাবুল আহমদ, শফিকুর রহমান, ফখরুল ইসলাম, সাংবাদিক মো. আব্দুস শহিদ, তৌরিছ আলী, খালেদ আহমদ, বাহরাম খান, সায়েম ইবনে খয়ের ও সোনিয়া বিনতে খয়ের প্রমুখ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন শাহরিয়ার খান শাকিব। নাতে রাসুল পরিবেশন করেন আব্দুর রহিম, হামদ পরিবেশন করেন প্রাক্তন ছাত্র ফরহাদ আলম খোকন এবং মাদরাসা সংগীত পরিবেশন করেন হাফিজ ওয়াহিদুর রহমান মাসুম।

প্রধান অতিথির উপস্থিতিতে প্রাক্তন ছাত্র ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী কামরান আহমদ খালিছাদারের পক্ষ থেকে সংবর্ধিত শিক্ষককে সম্মাননা উপহার হিসেবে ৪ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করা হয়। এছাড়া আয়োজকদের পক্ষ থেকে মাদরাসার সাবেক শিক্ষক ও সাবেক-বর্তমান কমিটির সভাপতিদের সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠান শেষে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা স্মৃতিচারণ করে বলেন, এই মাদরাসায় আমাদের জীবনের সোনালি সময় কেটেছে। পুনর্মিলনীতে এসে সেই দিনগুলো যেন আবার ফিরে পেলাম। কিন্তু আমাদের পিতৃতুল্য প্রিয় সুপার হুজুরের বিদায়ের মুহূর্তে আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়—নিজেদের ধরে রাখতে পারিনি।

এই সম্পর্কিত আরো