আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জ-২ দিরাই-শাল্লা আসনে বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন এখন স্থানীয় রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয় হয়ে উঠেছে। একই আসনে দলীয়ভাবে দুইজন প্রার্থীকে ঘিরে বার্তা আসায় নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা। কে হচ্ছেন শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের চূড়ান্ত প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী নাকি তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকায় পুরো নির্বাচনী এলাকাজুড়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট না হওয়ায় মাঠপর্যায়ে কার্যত দুইটি বলয় সক্রিয় রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সংগঠনের ঐক্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে, অন্যদিকে তৃণমূলের কর্মীরা কোন নেতৃত্বের অধীনে কাজ করবেন সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন না।
অনেক নেতাকর্মীর অভিমত, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, সিদ্ধান্তহীনতা ততই বিএনপির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। নাছির উদ্দিন চৌধুরী এই আসনে দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। বয়সের ভার থাকলেও তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং পুরোনো সমর্থকগোষ্ঠী এখনো সক্রিয় রয়েছে। তবে শারীরিক অসুস্থতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্যে ও আড়ালে আলোচনা চলছে। অনেকের প্রশ্ন বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রচারণা, মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি ও নির্বাচনী ব্যয় সামাল দেওয়া তাঁর পক্ষে কতটা সম্ভব।
অন্যদিকে, পাবেল চৌধুরী অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং ভোটের মাঠে তুলনামূলকভাবে সক্রিয় হলেও সংগঠনের মাঝে ঐক্য গড়ে তুলতে এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
দলীয় সূত্র বলছে, পুরোনো গ্রুপিং ও বলয়ভিত্তিক রাজনীতির কারণে তিনি পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন না। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাংগঠনিক দুর্বলতা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের সুযোগে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান জোরালো করার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শিশির মনির দিরাই-শাল্লা এলাকায় নানাভাবে সক্রিয় রয়েছেন। স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও অর্থ সহায়তার মাধ্যমে তিনি নিজের উপস্থিতি দৃশ্যমান করছেন বলে জানা যায়।
বিএনপির নেতাকর্মীদের আশঙ্কা দলীয় সিদ্ধান্তহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সক্রিয়তা ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। নাছির চৌধুরী বলয়ের ভাটিপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি সৈদুর রহমান তালুকদার বলেন, দল যদি দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছায়, তাহলে মাঠের কর্মীরা দিকনির্দেশনা হারাবে এবং এর সুবিধা নেবে প্রতিপক্ষ।
অন্যদিকে, পাবেল চৌধুরী বলয়ের দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মনে করেন, সময়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শক্ত ও মাঠে সক্রিয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া জরুরি, নইলে নির্বাচনী লড়াই কঠিন হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মূল সংকট এখন প্রতিপক্ষের শক্তি নয়, বরং নিজেদের ভেতরের সিদ্ধান্তহীনতা ও ঐক্যের অভাব।
স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মতে, দ্রুত একজনকে চূড়ান্ত করে দলীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে না পারলে দিরাই-শাল্লা আসনে ধানের শীষের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কে হচ্ছেন শেষ পর্যন্ত বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী সে সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে পুরো নির্বাচনী এলাকা।