হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশ সদস্যদের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও হুমকী প্রদান করায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সদস্য সচিব মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
আজ শনিবার সন্ধা ৭টার দিকে হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর এলাকার একটি বাসা বাসা থেকে ডিবি পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে আসে। পরে তাকে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানা নিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াসমিন আখতার। তবে কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সেটি এখনো নিশ্চিত করেননি তিনি।
এদিকে, মাহদিকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সদর থানার সামনে জড়ো হন বৈষম্যবিরোধী নেতারা। পরে তারা থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন। পুলিশকে তীর্যক ভাষায় আক্রমণও করেন তাদের কয়েকজন।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, কোন মামলা ছাড়াই মাহদীকে বাসা থেকে তুলে এনেছে সাদা পোষাকের পুলিশ। মাহদীর মুক্তিও দাবি করেছেন তারা।
এদিকে, বিক্ষোভ থামাতে রাতে থানা এলাকায় অবস্থান নিয়েছে সেনাবাহিনীর একটি দল।
এর আগে, শুক্রবার চাত্রলীগের কমিটিতে নাম থাকায় জুলাই অভূত্থানের সক্রিয় সদস্য নয়ন নামে এক নেতাকে ডেবিল হান্ট অভিযানে আটক করে। এ সময় তাকে ছাড়িয়ে আনতে গেলে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির সাথে উত্তপ্ত বাক্য প্রয়োগ করেন মাহদি। এরপর থেকে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোড়ন তৈরী হয়।
জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এনামুল হাসান নয়নকে আটক করে পুলিশ। নয়ন জুলাই আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী দাবি করে শুক্রবার দুপুরে তাকে ছাড়াতে থানায় গিয়ে পুলিশের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাহদীসহ কয়েকজন নেতা।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এ ঘটনার ওই ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, থানার ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সামনে বসে আছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকর্মী। পুলিশের সাথে তারা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করছেন।
এসময় মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘এই সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল, এই গভমেন্ট আমরা গঠন করেছি। অথচ আপনি আমাদের ছেলেদের ধরে নিয়ে আসছেন। আবার এখন বার্গেনিং করছেন।’
ওই নেতা আরও বলনে, ‘এখানে ১৭ জন শহীদ হয়েছে। সবচেয়ে ক্রুশাল আন্দোলন যেসব জায়গায় হয়েছে সেখানে হবিগঞ্জ একটা। বানিয়চং থানা কিন্তু আমরা পুড়াই দিছিলাম, এসআই সন্তোষকে জ্বালাই দিছিলাম। এখন কোন সাহসে তাদের ধরে নিয়ে আসা হলো আমি জানতে চাই’।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মাহদী হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ছাত্রলীগ করার কারণে যদি একটা মানুষ অপরাধী হয়ে থাকে তাহলে তো আমাদের মূল সমন্বয়কারী ভাই যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে যেমন সারজিস আলম ভাই, উনিও একসময় ছাত্রলীগের সাথে জড়িত ছিলেন, তাহলে তো উনিও অপরাধী।
তিনি বলেন, এনামুল হাসান নয়ন আগে ছাত্রলীগ করলেও জুলাই আন্দোলনের সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলেন। যার প্রমাণ পুলিশকে দেওয়ার পরও তারা নয়নকে ছাড়তে রাজী হয়নি। উল্টো থানার ওসি আমাদের বলেছেন- ‘আন্দোলন করেছে বলে কি হয়েছে, সে তো একসময় ছাত্রলীগ ছিলো।’
ওসির সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওসির সাথে প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করি, কিন্তু ওসি আমাদের গুরুত্ব না দেওয়ায় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।
তিনি বলেন, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় কিন্তু এটাই প্রথম ঘটনা নয়, এরকম আরও ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, এ ঘটনার পেক্ষিতে শনিবার দুপুরে মাহদীকে কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সংগঠনটির ফেসবুক পেজ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মাহদীকে দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শোকজ নোটিশে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে সংগঠনের সকল প্রকার সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন সাক্ষরিত এ নোটিশে বলা হয়, ২ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মাহদী হাসানের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। ওই বক্তব্যগুলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জনপরিসরে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে বলে কেন্দ্রীয় কমিটি মনে করে।
এর প্রেক্ষিতে শনিবার কারণ দর্শানোর নোটিশে মাহদী হাসানকে তার বক্তব্য প্রদানের কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, তার বিরুদ্ধে কেন স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে লিখিত জবাব আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি রিফাত রশিদ বরাবর দপ্তরের মাধ্যমে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মাহদী হাসান সংগঠনের কোনো ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বানিয়াচং থানায় এসআই সন্তোষকে পিটিয়ে হত্যা করে উত্তেজিত জনতা। এরপর তার লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এরআগে সংঘাত থামাতে পুলিশের গুলিতে ওই এলাকায় ৯ জন নিহত হন।
গত ২৫ জুলাই এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন করে বিবিসি বাংলা। এতে থানায় বাছাই করে পুলিশ কর্মকর্তা সন্তোষকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ তোলা হয়।