সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

সাতকাহনের ‘দীপাবলী’র অনুপ্রেরণায় বিসিএস প্রশাসনে হাওরপাড়ের তানিয়া

সমরেশ মজুমদারের কালজয়ী উপন্যাস ‘সাতকাহন’-এর লড়াকু চরিত্র ‘দীপাবলী’র অনুপ্রেরণা এবং বাবার দেখা স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ের মেয়ে তানিয়া আক্তার তিন্নি। ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। দিরাই উপজেলার দ্বিতীয় নারী হিসেবে এই কৃতিত্ব অর্জন করে তিনি কেবল নিজের পরিবার নয়, পুরো হাওরবাসীর মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

তানিয়া আক্তার তিন্নি দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেকের ছোট মেয়ে। তার এই সাফল্যে রফিনগর গ্রামসহ পুরো এলাকায় আনন্দের বন্যা বইছে।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে তানিয়ার বাবা ২০০৫ সালে পরিবার নিয়ে সিলেটে স্থায়ী হন। বাবার সেই ত্যাগের মর্যাদা রেখেছেন মেধাবী তানিয়া। তিনি প্রাথমিকে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, সিলেট বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞানে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং সিলেট এমসি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) থেকে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

নিজের সাফল্যের পেছনে পরিবারের অবদানের কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত তানিয়া বলেন, আমার বড় বোন তানভী লায়লা শিরিন আপু আমাকে ছোটবেলা থেকে হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাত্র এক সপ্তাহ আগে বাবা মারা যান। এরপর থেকে মা এবং আপু ছায়ার মতো পাশে ছিলেন। স্কুল-কলেজে যাতায়াত থেকে শুরু করে ঢাকায় পরীক্ষা দিতে যাওয়া—সবখানেই মা সঙ্গ দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালে বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতা তাকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করেছে, যা এই দীর্ঘ যাত্রায় বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডার বেছে নেওয়ার পেছনের গল্পটি বেশ চমকপ্রদ। তানিয়া জানান, শুরুতে তার ইচ্ছা ছিল পুলিশ প্রশাসনে যোগ দেওয়ার। কিন্তু তিনটি বিশেষ কারণে তার লক্ষ্য পরিবর্তন হয়।

প্রথমত, একজন জ্যেষ্ঠ ভাই তাকে প্রশাসন ক্যাডার দিতে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, যা তার মনে এই ক্যাডার সম্পর্কে উল্টো কৌতূহল জাগিয়ে তোলে।

দ্বিতীয়ত, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় বেড়াতে গিয়ে ‘হাওর বিলাস’সহ তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) উন্নয়নমূলক কাজ দেখে তিনি মুগ্ধ হন। তিনি উপলব্ধি করেন, একজন ইউএনও চাইলে একটি জনপদের চিত্র বদলে দিতে পারেন।

তৃতীয়ত ও অন্যতম প্রধান কারণ হলো সাহিত্যের প্রভাব। তানিয়া বলেন, সমরেশ মজুমদারের ‘সাতকাহন’ উপন্যাসের দীপাবলী চরিত্রটি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একজন প্রশাসক হিসেবে সমাজে ইতিবাচক ও উন্নয়নমূলক পরিবর্তন আনার স্বপ্ন সেখান থেকেই প্রবল হয়।

তানিয়ার এই অর্জনে রফিনগর গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের মতে, হাওরপাড়ের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে তানিয়ার এই সাফল্য এলাকার অন্য মেয়েদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে। পরিবার, স্বজন ও জনপ্রতিনিধিরা তার উজ্জ্বল কর্মজীবন কামনা করেছেন।

এই সম্পর্কিত আরো