সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
✔ বাংলা টেক্সট কনভার্টার
শিরোনাম
advertisement
সিলেট বিভাগ

জন্ম নিবন্ধনে বয়স জালিয়াতি, সিলেটে বাল্যবিয়ের নতুন চোরাগলি

সিলেটের গ্রামীণ ইউনিয়ন এবং শহরের আবাসিক এলাকায় জন্মসনদে কৃত্রিমভাবে বয়স বাড়ানোর প্রবণতা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। সামান্য টাকার বিনিময়ে কাগজে ১৫–১৬ বছরের কিশোরীকে ‘১৮ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক’ বানিয়ে দেওয়ার এই অন্ধকার ব্যবসা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকৃত বয়স মাত্র ১৪–১৫ বছর হলেও জন্মসনদে বয়স ১৮ দেখিয়ে নিয়মিতভাবে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এখন বাল্যবিয়ের পুরো প্রক্রিয়াকে বৈধতার আবরণ পরিয়ে দেওয়ার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

শুধু গ্রামে নয়, শহরের কিছু আবাসিক এলাকায়ও এই প্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে কাগজে সব ঠিক থাকায় প্রশাসন প্রায়ই বাধা দিতে পারছে না। জন্মনিবন্ধনের এই জালিয়াতি শুধু একটি নথি পরিবর্তন নয়—এটি কিশোরীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং শিশুকালকে ছিনিয়ে নেওয়ার সুসংগঠিত পথ, যার ফাঁক দিয়ে প্রতিদিনই অগণিত মেয়েকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে সময়ের আগেই বিবাহ, গর্ভধারণ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার গভীর অন্ধকারে।

নগরীর আম্বরখানা বড় বাজার এলাকার বাসিন্দা নবম শ্রেণির ছাত্রী মারজিয়া আক্তার (ছদ্মনাম) তারই একটি উদাহরণ।

তার বাবা মোঃ আবুল কাশেম (ছদ্মনাম) জানিয়েছেন- আমার মেয়ে বর্তমানে নবম শ্রেণিতে পড়ে এবং বয়স মাত্র ১৫ বছর। কিছুদিন আগে সে একটি ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায়। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি। পরে জানতে পারি, তারা বিয়ে করেছে, আর তার জন্মনিবন্ধে বয়স ১৮ বছর দেখানো হয়েছে। এই অবস্থায় আমরা আর কিছু করতে পারিনি, বাধ্য হয়ে বিষয়টি মেনে নিতে হয়েছিল।

নগরীর গোয়াই পাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন মৌ আক্তার ও হৃদয় আহমদ দম্পতি। উভয়ের বয়স এখনও ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি, যার কারণে তারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নন। তবু তারা ইতিমধ্যেই একটি কন্যা সন্তানের মা-বাবা। দম্পতি দাবি করেছেন, আমরা বৈধভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি এবং আমাদের পরিবার এই সম্পর্ককে সম্মান জানাবে। বয়স আমাদের জন্য কোনও বাধা হয়নি, আমরা নিজেদের পরিবারের মতো জীবন শুরু করেছি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই বছরে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের আবেদন অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। একটি ইউনিয়নের হিসাব অনুযায়ী, ছয় মাসে ৭২টি বয়স সংশোধনের আবেদন এসেছে—এদের মধ্যে ৬০ শতাংশ মেয়েদের। একই পরিবারের একাধিক মেয়ের জন্মতারিখ হঠাৎ কয়েক বছর এগিয়ে যাওয়ার ঘটনাও এখন সাধারণ ব্যাপার। ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্রের সামনে দাঁড়ালে খুব সহজেই শোনা যায় ‘বয়স বাড়ানোর’ কথাবার্তা। কেউ কেউ সরাসরি বলে, “বিয়ার কাজ আছে, বয়সটা বাড়াইয়া দেন।” বয়স বাড়ানোর বিনিময়ে নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত।

এ বিষয়ে খাসদবীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদ নেওয়াজ বলেন—আমরা প্রায়ই দেখি, পঞ্চম–ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা হঠাৎ করে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। পরে জানতে পারি—জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়িয়ে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এত কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়াটা শুধু দুঃখজনক নয়, ভয়াবহও। এতে তাদের শিক্ষাজীবন থেমে যায়, স্বপ্ন ভেঙে যায়। অনেক সময় অভিভাবকেরাও সামাজিক চাপ, আতঙ্ক বা ‘সম্মান রক্ষা’র তাড়নায় বাধ্য হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেন। শিক্ষক হিসেবে আমাদের চোখের সামনে এই শিশুরা আগেভাগে বড় হয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে—এটাই সবচেয়ে কষ্টের।

এ বিষয়ে ৩নং খাদিমনগর ইউনিয়নের সদস্য আতাউর রহমান শামিম বলেন—জন্মনিবন্ধনে বয়স বাড়িয়ে বিয়ে দেওয়াটা এখন দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুব সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত বয়সের আগেই ছেলে-মেয়েদের বিয়ের চাপ নিতে হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক, মানসিক ও শিক্ষাজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। প্রশাসন ও স্থানীয়ভাবে সবাইকে একসঙ্গে কঠোর নজরদারি না করলে এই চক্র থামানো কঠিন হবে।

অল্প বয়সে বিয়ে ও প্রাথমিক গর্ভধারণ কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর ক্ষতি ডেকে আনছে। এই বিষয়ে চিকিৎসকদের সাথে কথা বললে- সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন-অতিরিক্ত কম বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্ব কিশোরীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অল্প বয়সে গর্ভধারণের ফলে তাদের মধ্যে গর্ভপাতের হার বেশি থাকে, প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও জটিলতার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। এতে রক্তশূন্যতা, অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। শুধু শারীরিক নয়, আগেভাগে সংসার ও মাতৃত্বের চাপ তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকেও গভীরভাবে আঘাত করে। এ বয়সে এমন ঝুঁকি নেওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়,এটি তাদের সারাজীবনের সুস্থতা ও ভবিষ্যৎকে বিপদে ফেলছে।

এ বিষয়ে সিলেট বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. আনিসুর রহমান বলেন—অল্প বয়সে বিয়ে ও মাতৃত্ব এক কথায় সবদিক থেকেই ক্ষতিকর। এ বয়সে বিয়ে হলে কিশোরী মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি থেমে যায়, পড়ালেখা বন্ধ হয়ে ভবিষ্যৎও সংকুচিত হয়ে পড়ে। আরও উদ্বেগজনক হলো—অপরিণত শরীরে সন্তানের জন্ম দিলে নবজাতকেরও অপুষ্টি, কম ওজন, দুর্বল প্রতিরোধক্ষমতাসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। ফলে পুরো ভবিষ্যৎ প্রজন্মই শারীরিক-মানসিকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই বয়স জালিয়াতি করে বাল্যবিয়ে করানো শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়—এটি জনস্বাস্থ্য, সমাজ এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুতর হুমকি।

এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন—জন্মনিবন্ধন একবার তৈরি হলে এর জন্মতারিখ পরিবর্তনের কোনো আইনসম্মত সুযোগ নেই। কিন্তু কেউ যদি পরবর্তীতে নতুন করে জন্মনিবন্ধন বানিয়ে বয়স কমিয়ে দেখায়—সেটা সরাসরি জালিয়াতির শামিল। এ ধরনের জালিয়াতি ঠেকাতে ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বয়স গোপন বা পরিবর্তনের পথ খোলা থাকলে বাল্যবিয়ে রোধ করা সম্ভব নয়। তাই জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখা স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের যৌথ দায়িত্ব।

এই সম্পর্কিত আরো