বাংলার লোকসংগীতের ভান্ডারে অসংখ্য কালজয়ী গান রেখে গেছেন বাউল সাধক ও গীতিকবি দুর্বিণ শাহ। তাঁর সৃষ্টিতে প্রেম, বিরহ, আধ্যাত্মিকতা ও জীবনদর্শনের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। ‘নির্জন যমুনার কূলে’, ‘আমার অন্তরায় আমার কলিজায়’, ‘নামাজ আমার হইলো না আদায়’ কিংবা ‘বন্ধু যদি হইতো নদীর জল’—এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা এই সাধকের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ছাতকে নানা আয়োজন করা হয়েছে।
সোমবার দুর্বিণ শাহ পরিষদ ও ভক্তবৃন্দের উদ্যোগে জন্মবার্ষিকী পালন করা হয়। এ উপলক্ষে সন্ধ্যা থেকে রাতব্যাপী দুর্বিণ শাহের রচিত গান নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ মহি উদ্দিন।
দুর্বিণ শাহের নাতি অনিক শাহের সভাপতিত্বে এবং শিক্ষক অজয় পালের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে জ্ঞানের সাগর দুর্বিণ শাহের জীবন, কর্ম ও সংগীতসাধনা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন ইউএনও মোহাম্মদ মহি উদ্দিন, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহ আলম, ছাতক প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি সিবিএ-বি-৮০-এর সাধারণ সম্পাদক শফি উদ্দিন, ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সামসুর রহমান বাবুল ও লোকগবেষক জাকির শাহ। স্বাগত বক্তব্য দেন অজিত কুমার দাস।
বক্তারা বলেন, দুর্বিণ শাহ শুধু একজন গীতিকবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক ভাবধারার এক অনন্য সাধক। তাঁর গান মানুষের প্রেম, বিরহ, আত্মোপলব্ধি ও স্রষ্টার প্রতি অনুরাগের কথা বলে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম বাংলা লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর গান ও দর্শন তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, বাউল সাধক দুর্বিণ শাহ ১৯২০ সালের ২ নভেম্বর সিলেটের ছাতক উপজেলার নোয়ারাই গ্রামের তারামনি টিলায় জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে টিলাটি দুর্বিণ টিলা নামে পরিচিত। তাঁর বাবা সফাত আলী শাহ ছিলেন সুফি সাধক এবং মা হাসিনা বানু ছিলেন একজন পীর। আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই সংগীত ও সাধনার জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে একই ইউনিয়নের জোড়াপানি গ্রামের সরুফা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
১৯৬৭ সালে প্রবাসী বাঙালিদের আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড সফর করেন দুর্বিণ শাহ। এ সময় তাঁর অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন বাউল সাধক শাহ আবদুল করিম। সেখানে তাঁর গানের কথা ও সুরে মুগ্ধ হয়ে সংগীতপ্রেমীরা তাঁকে ‘জ্ঞানের সাগর’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
এই সাধক ১৯৭৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৫৭ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া গান, সুর ও দর্শন আজও বাংলার লোকসংগীতের ঐতিহ্যে অমর হয়ে আছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক সেলিম মাহবুব, তমাল পোদ্দার, যুবদল নেতা নোমান ইমদাদ কানন, শিল্পী জাহিদ হাসান সোহেল, মুকুল দে, রহিম শাহ, কালা শাহ, রাজু মণ্ডল, বাউলশিল্পী শাহিনুর আলমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিল্পী ও দুর্বিণ শাহের ভক্তবৃন্দ।