সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে প্রধানমন্ত্রীর মানবিক সহায়তার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, সরকারি তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতি ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে একই পরিবারের একাধিক সদস্য এবং কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রোববার বিকেলে উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের মল্লিকপুর বাজারে ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ব্যানারে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রিফাত উল্লাহ তালুকদার। কৃষক আলফাজুর রহমানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন মো. শাহাবাজ মিয়া, নজরুল ইসলাম, সবির উদ্দিন, রুবেল মিয়া, জুনু মিয়া, ফুল মিয়া, জিলান আহমেদ, রেজাউল করিম, আব্দুল আলম ও মো. নুরুজ্জামান।
বক্তারা বলেন, হাওর অঞ্চলের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা মানবিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ যাদের জমি পানিতে তলিয়ে যায়নি, এমনকি যারা কৃষিকাজই করেন না, তাদের মধ্যে অন্তত ১৮ জনের নাম সহায়তার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই পরিবারের দুই থেকে তিনজন সদস্যের নামও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তারা আরও বলেন, “আমরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যে ফসল ফলিয়েছিলাম, তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের নাম তালিকায় রাখা হয়নি। ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত ১৮ জনের নামে সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যাদের হাওরে কোনো জমিই নেই।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জুনু মিয়ার অভিযোগ, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আকাশ মিয়া তার তিন ভাইয়ের কাছ থেকে সহায়তার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলে ৩ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে তালিকায় নাম না থাকায় জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি পরে আলোচনা করবেন বলে জানান।
আরেক কৃষক ফুল মিয়া বলেন, তার নামে সহায়তার কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ইউপি সদস্য আকাশ মিয়া এক হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে তালিকায় নাম না থাকায় যোগাযোগ করলে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য হনুফা বেগম বলেন, আমার কাছ থেকে তিন ওয়ার্ডের প্রায় ৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার দেওয়া একটি নামও চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আকাশ মিয়া এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। তারা কারও কাছ থেকে টাকা নেননি। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রথমে দুই ওয়ার্ডে প্রায় ৩০০ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তালিকা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়। এতে অনেকের নাম বাদ পড়ে। বাদ পড়া ব্যক্তিরাই মানববন্ধন করে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে তারা দাবি করেন।
ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে মাইকিং করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম সংগ্রহ করা হয়েছে। এমপি মহোদয়ের প্রতিনিধি, ইউপি সদস্য ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে যাচাই-বাছাই শেষে তালিকা প্রণয়ন করা হয়। প্রথম তালিকায় প্রায় ১,৫০০ জনের নাম ছিল। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন নির্দেশনায় তালিকা অর্ধেকে নামিয়ে আনা হলে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম বাদ পড়ে। এ কারণেই তারা মানববন্ধন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, একজন ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে ইউনিয়ন পরিষদে এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ দেননি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।