সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার ইউনিয়নের রুপাবালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিভাগীয় পর্যায়ে কৃতিত্ব অর্জন করেছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে বালক টিমে বিদ্যালয়টি সিলেট বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। এর আগে দলটি সুনামগঞ্জ জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করে বিভাগীয় পর্যায়ে অংশ নেয়। এ সাফল্যের জন্য বিদ্যালয়টি ২০ হাজার টাকার প্রাইজমানি লাভ করেছে।
প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এমন সাফল্য অর্জন করেছে। খেলাধুলার জন্য নেই বড় মাঠ, নেই কোনো প্রশিক্ষণের সুযোগ। আঘাত পেলে উন্নত চিকিৎসার সামর্থ্যও নেই। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার দরিদ্র হওয়ায় পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থাও সীমিত। তারপরও অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমে তারা জেলার গণ্ডি পেরিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের সাচনা বাজার ইউনিয়নের রুপাবালী গ্রামের ছোট্ট এই বিদ্যালয়টি এখন এলাকায় পরিচিতি পেয়েছে খুদে ফুটবলারদের কারণে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের সামনে ছোট্ট মাঠে শিশুদের ফুটবল নিয়ে ছুটোছুটি। স্থানীয়রাও আগ্রহ নিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করছেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দানবেন্দ্র সরকার নিজেই শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার বিভিন্ন কৌশল শেখাচ্ছেন।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র তৌহিদুল ইসলাম তোহা খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে আরেক শিক্ষার্থী তাকে তুলে নেয়—এমন দৃশ্য যেন তাদের বন্ধুত্ব ও দলগত চেতনার প্রতীক। বিদ্যালয়ের ফুটবল দলের অধিনায়ক তানজিম হোসেন আবির বলেন, ফুটবল খেলতে আমার খুব ভালো লাগে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ায় আমরা আনন্দিত। তবে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম হতে না পারায় খারাপ লাগছে। আমাদের যদি বড় মাঠ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম।
প্রধান শিক্ষক দানবেন্দ্র সরকার বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠটি খুবই ছোট। এখানে ঠিকমতো প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় না। একটি বড় মাঠ থাকলে শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হতো। তারা জাতীয় পর্যায়েও জায়গা করে নিতে পারতো।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক আব্দুল আজিজ তালুকদার বলেন, “যারা ফুটবল খেলে তাদের অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র। খেলাধুলায় যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, সেই অনুযায়ী খাবার দিতে পারেন না অভিভাবকরা। এছাড়া প্রধান শিক্ষক ছাড়া বিদ্যালয়ের বাকিরা নারী শিক্ষক। বিদ্যালয়ে কোনো দৃষ্টিনন্দন ভবনও নেই। একটি টিনশেড ভবনে পাঠদান চলে। ছোট মাঠের কারণে ছেলে-মেয়েরা খেলাধুলায় সমস্যায় পড়ে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়রা একসঙ্গে সহযোগিতা করলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলায় আরও বড় সাফল্য অর্জন করতে পারবে। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা পিযুষ কান্তি মজুমদার বলেন, প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও যে অসাধারণ মেধা ও প্রতিভা রয়েছে, রুপাবালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ সাফল্য তার উজ্জ্বল উদাহরণ। সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বিভাগীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে পুরো উপজেলাকে গর্বিত করেছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়দের সম্মিলিত সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়েও আরও বড় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।