দীর্ঘ ৪৬ বছর পর এশিয়ার শীর্ষ নারী ফুটবল আসরের মহাদেশীয় মঞ্চে অংশ নিলেও হতাশাজনক ফল নিয়েই আসর শেষ করেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। টানা তিন ম্যাচে পরাজয়ের ফলে পয়েন্টশূন্য অবস্থায় টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের। মাঠের ফলাফলের পাশাপাশি দল পরিচালনা ও প্রস্তুতি নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচে চীনের কাছে ২–০ গোল ব্যবধানে হার দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশের যাত্রা। দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৫–০ গোলের বড় পরাজয় দলকে আরও চাপে ফেলে। শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষেও একই চিত্র দেখা যায়।
সোমবার পার্থের অপটাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল উজবেকিস্তান। ম্যাচের ১০ মিনিটে দিয়োরাখোন খাবিবুল্লায়েভার গোলে এগিয়ে যায় তারা। দ্বিতীয়ার্ধে দীলদোরা নোজিমোভা জোড়া গোল করেন। শেষ দিকে নিলুফার কুদ্রাতোভা আরও একটি গোল যোগ করলে ৪–০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় উজবেকিস্তানের। এতে পয়েন্টশূন্য অবস্থায় টুর্নামেন্ট শেষ করে বাংলাদেশ।
তবে শুধু মাঠের ফলাফলই নয়, এই ব্যর্থতার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফুটবল বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক আসরের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ম্যাচ, উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং বৈজ্ঞানিক ফিটনেস পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। ফলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে কৌশল ও শারীরিক সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়তে হয়েছে দলকে।
দলকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসা এবং প্রস্তুতি প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রস্তুতি ক্যাম্প, দল ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, নারী ফুটবলের উন্নয়নের নামে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, সেটিও এখন পর্যালোচনার দাবি রাখে। এমনকি দলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও ফিটনেস সহায়তা না থাকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় এসে স্থানীয়ভাবে ফিজিওর ব্যবস্থা করার ঘটনাকেও প্রস্তুতির দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনার ঘাটতি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং সমন্বয়ের অভাব নারী ফুটবলের অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে। মাঠে খেলোয়াড়রা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার প্রভাব তাদের পারফরম্যান্সে পড়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দল নির্বাচন, প্রস্তুতি ম্যাচ এবং সহায়ক স্টাফ নিয়েও কোচিং স্টাফ ও প্রশাসনের মধ্যে মতপার্থক্যের বিষয়টি সামনে এসেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এই সমন্বয়হীনতাও দলের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে গ্যালারিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পতাকা হাতে তারা পুরো ম্যাচজুড়ে দলকে সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু মাঠের ফলাফল তাদের হতাশ করেছে।
প্রবাসী সমর্থক আবিদুর রহমান বলেন, “স্টেডিয়ামজুড়ে আমরা বাংলাদেশ পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সমর্থনে কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু শুধু সমর্থন দিয়ে হবে না—প্রশাসনিকভাবেও দলকে শক্তভাবে গড়ে তুলতে হবে।”
নারী ফুটবল অনুরাগী নাজমিন আক্তার বলেন, “খেলোয়াড়দের সামর্থ্যে আমাদের বিশ্বাস আছে। কিন্তু প্রস্তুতি, ফিটনেস সহায়তা এবং পরিকল্পনা যদি সময়মতো নিশ্চিত করা যেত, তাহলে ফল ভিন্ন হতে পারত।”
বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় সাবেক ফুটবলার ও কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু বলেছেন, বড় আসরে অংশ নিতে হলে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ম্যাচ এবং দক্ষ সহায়ক স্টাফ অপরিহার্য। এবারের প্রস্তুতিতে সেসব পূর্ণতা পায়নি বলেই মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফুটবল ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী সদস্য সাঈদ হাসান কানন বিষয়টি নারী উইং ও ফেডারেশনের সভাপতির ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করেছেন।
ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় টানা পরাজয় এবং পয়েন্টশূন্য বিদায় বাংলাদেশের নারী ফুটবলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রশাসনিক দুর্বলতা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এখনই সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে একই ধরনের হতাশাজনক ফল দেখতে হতে পারে।