ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে সিলেটে বইছে আগাম নির্বাচনী হাওয়া। নগরজুড়ে শুভেচ্ছা বার্তার আড়ালে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন বিএনপির এক ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের দীর্ঘ তালিকায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক ও সিলেট বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান।
সিলেটের রাজনীতিতে অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান জামান এক আপোষহীন নাম। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত এই নেতা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে একাধিকবার কারাবরণ করেছেন। বিগত সরকারের আমলে তাঁর বিরুদ্ধে ৭৯টি রাজনৈতিক মামলা দেওয়া হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে সম্মুখ লড়াই করতে গিয়ে তিনি স্বৈরাচারী সরকারের বাহিনীর গুলিতে গুরুতর আহত হন।
দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রশ্নাতীত। ২০১৩ সালের সিসিক নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও দলের স্বার্থে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে কাজ করেন। এমনকি ২০১৮ এবং ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনেও দলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি একাধিকবার নিজের প্রার্থিতা বিসর্জন দিয়েছেন। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মতে, বারবার আত্মত্যাগ করা এই নেতা এবার নগরপিতা হিসেবে দলের মূল্যায়ন পাওয়ার জোরালো দাবিদার।
সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী মেয়র পদে নিজের প্রার্থিতার কথা স্পষ্ট করেছেন। প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকে তিনি আগামী নির্বাচনের ‘ড্রেস রিহার্সেল’ হিসেবে দেখছেন।
যদিও তিনি সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় যত্রতত্র পোস্টার-ব্যানার না লাগানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।
মেয়র পদের দৌড়ে আরও রয়েছেন মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। দীর্ঘদিনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে তিনি পুঁজি করতে চান।
মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নাছিম হোসাইন, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থেকে নিজের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাইয়ুম জালালী পংকী এবং সাবেক আহ্বায়ক মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিনারও দলের মনোনয়নের প্রত্যাশায় প্রচারণা চালাচ্ছেন।
সিলেট বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম ১৯৯৫ সাল থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়ে আসছেন। ২০১৮ সালে দলের স্বার্থে সরে দাঁড়ানো এই নেতা এবার সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী না হয়ে আরিফুল হক চৌধুরীকে সমর্থন দিয়েছেন। ফলে এবার সিসিক নির্বাচনে তিনিও মনোনয়নের জোরালো দাবিদার।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে বিএনপি জয়ী হলেও জামায়াতে ইসলামীর ভোট নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। ২০১৮ সালে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী যেখানে মাত্র ১১ হাজার ভোট পেয়েছিলেন, সেখানে এবারের সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রার্থী ১ লাখ ৩৪ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান বিএনপিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। দলীয় বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই উত্থান রুখতে হলে এমন একজনকে প্রার্থী করতে হবে যার রাজপথে ত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
তফসিল ঘোষণা না হলেও সিসিক নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির অন্দরে এখন তুমুল প্রতিযোগিতা। একদিকে বর্তমান প্রশাসকের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে সামসুজ্জামান জামানের মতো ত্যাগী ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের দাবি—সব মিলিয়ে কেন্দ্র কাকে বেছে নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।