সিলেটের গোয়াইনঘাটে পিয়াইন নদীর বুক চিরে সরকারি সম্পদ লুটপাটের এক ভয়াবহ স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছে ‘ফাইভ স্টার গ্রুপ’ নামক একটি সিন্ডিকেট। উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং মুহুর্মুহু অভিযানের মুখেও থামছে না এই চক্রের তান্ডব। সিন্ডিকেটের দুই মূল হোতা—জাফলং ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহাগ মিয়া এবং প্রভাবশালী আব্দুল মালেক ওরফে কালো মানিকের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে জাফলং সীমান্ত এখন লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ এক শ্রমিকের পকেটে মিলছে এই সিন্ডিকেটের ‘পরিচয়পত্র’, যা জাফলংজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
তবে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান যোগদানের পর থেকেই চোরাকারবারীদের যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর নির্দেশে পুলিশ নিয়মিত বালি ও পাথর জব্দ এবং দানবযন্ত্র ধ্বংস করছে। কিন্তু সোহাগ ও কালা মানিক সিন্ডিকেট অত্যন্ত চতুর। তারা ছোট ছোট কিশোরদের এবং সাধারণ দিনমজুরদের ‘হিউম্যান শিল্ড’ বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রশাসনের পথ আগলে দাঁড়ায়। তাঁর মব সৃষ্টির চেষ্টা করে। তাছাড়া পাথর ও বালি উত্তোলনের জন্য ‘ফেলুডার ফারুক’ এর মতো ব্যক্তিদের যন্ত্র ভাড়া করে রাতের গভীরে দুর্গম এলাকায় কাজ চালায়।
সম্প্রতি ৩ নম্বর পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের জুমপাড় এলাকায় রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকালে একটি পেলোডারের (দানবযন্ত্র) চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন স্পট ম্যানেজার পারভেজ আহমেদ (২৭)। মর্মান্তিক এই মৃত্যুর পর নিহতের পকেট থেকে ‘ফাইভ স্টার গ্রুপ’-এর একটি পরিচয়পত্র পাওয়া যায়। এই একটি কার্ডই ফাঁস করে দিয়েছে সোহাগ ও কালা মানিকের পুরো সিন্ডিকেটের নাম। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু পারভেজ নয়, এই সকল বালুখেকো সিন্ডিকেটের লালসার বলি হয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর চা-বাগান এলাকায় পাড় ধসে মারা যান বাচ্চু মিয়া (৫০)। এর আগে ২০২৩ সালেও ড্রেজার চাপায় প্রাণ হারান নুর মোহাম্মদ নামের এক যুবক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পিয়াইন নদীর পরিবেশ ধ্বংসের মূল কারিগর এই সোহাগ ও কালা মানিক। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সোহাগ মিয়া কৌশলে ‘শ্রমিক নেতা’র খোলস পরে পুরো জুমপাড় ও বল্লাঘাট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতি রাতে অন্তত ১৫টি পয়েন্ট থেকে লাখ লাখ টাকার বালি ও পাথর লুট হচ্ছে।
অন্যদিকে, আব্দুল মালেক ওরফে কালো মানিক জাফলং সেতুর নিচ থেকে রাতের আঁধারে বালি উত্তোলনের একচ্ছত্র অধিপতি। গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে সম্প্রতি কালা মানিকের একটি পেলোডার মেশিন জব্দ করলেও দমে যাননি তিনি। অভিযোগ রয়েছে, কালা মানিক কতিপয় নামধারী সাংবাদিককে ‘ম্যানেজ’ করে এবং বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার সরাসরি আশ্রয়ে এই লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সমেদ মিয়া ও জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতার সরাসরি ইশারায় সোহাগ ও কালা মানিক জাফলংয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। সমেদ মিয়া সাবেক সংসদ সদস্যের স্টেজ ভাঙচুর ও পরিবেশ ধ্বংসসহ একাধিক মামলার আসামি। পুলিশি অভিযানের ভয়ে তিনি প্রায়ই আত্মগোপনে থাকেন।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ফাইভ স্টার গ্রুপের সোহাগ মিয়ার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের সাথে জড়িত স্বীকার করে বলেন, জাফলংয়ে সবকিছুই অবৈধ আখ্যা দিয়ে বলেন, সারাদেশে এভাবে অবৈধভাবে চলছে , আমি ব্যবসা করছি।
আব্দুল মালেক ওরফে কালো মানিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে বলেন ভাই আপনি একটি প্রাইভেটকার রিজার্ভ করে জাফলং চা খেতে চলেন আসেন আমি আপনার সাথে দেখা করে কথা বলতে চাই।
এ ব্যাপারে জাফলং ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সমেদ মিয়া তাঁর উপর উঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সোহাগ মিয়া এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের জেলা কমিটির কাছে তিনি সোহাগের বিরুদ্ধে মৌখিকভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অভিযোগ জানিয়েছেন। কালো মানিকের বিষয়ে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, সে (কালো মানিক) আমার সংগঠনের কেউ নয়। তিনি বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার মদদে এসব অবৈধ লুটপাট চালাচ্ছেন।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান বলেন, বালু ও পাথর লুটপাট বন্ধে আমরা শতভাগ অনড় অবস্থানে আছি। আমরা অবৈধভাবে বালি উত্তোলনকারীদের গ্রেফতার করছি। দিনে রাতে অভিযান পরিচালনা করে মেশিনও জব্দ করছি। গোয়াইনঘাটে অপরাধীদের ঠাঁই নেই।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আমরা নিয়মিত টাস্কফোর্স পরিচালনা করছি। পরিবেশ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় যারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা পিছুপা হবো না।
সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, শুধু শ্রমিকদের জেল-জরিমানা নয়, বরং সোহাগ এবং কালো মানিকের মতো মূল গডফাদারদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করলেই জাফলংয়ের পরিবেশ ও মানুষের জানমাল রক্ষা পাবে।