সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কালাইরাগ বালু মহাল থেকে অবৈধভাবে বালু লুটের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতে এবং মামলা থেকে নাম বাদ দিতে পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাবের একাংশের সভাপতি আব্দুল আলিম, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট অন্তত ১০ লাখ টাকার ‘মামলা বাণিজ্য’ করেছে। এতে প্রকৃত লুটপাটকারীরা পার পেয়ে গেলেও আসামি করা হয়েছে এলাকার সাধারণ ও নিরপরাধ মানুষকে।
সরেজমিনে জানা যায়, গত ২২ ডিসেম্বর (সোমবার) কালাইরাগ বালু মহালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু ট্রাক, ট্রাক্টর ও পেলোডার আটক করে। অভিযানে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম খান এবং এসআই সিকান্দারসহ একদল পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মালামাল আটকের পরপরই ঘটনাস্থলের অদূরে এসআই সিকান্দারের সাথে জড়িতদের এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিন লাখ টাকার রফাদফার বিনিময়ে তাৎক্ষণিকভাবে যানবাহন ও জড়িত ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই খবর জানাজানি হলে জনরোষ ও সাংবাদিক মহলে গুঞ্জন এড়াতে তড়িঘড়ি করে মামলার প্রক্রিয়া শুরু করে পুলিশ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলার তালিকা থেকে মূল হোতাদের নাম বাদ দিতে রাতভর চলে লবিং। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ইউপি সদস্য কাজল সিংহের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাব উদ্দিনের নাম বাদ দিতে তিনি জন প্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করেছেন।
একটি সূত্র জানায়, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহাব উদ্দিনের নাম বাদ দিতেই পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নামে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এবং ম্যানেজের দ্বায়িত্বে ছিলেন সাংবাদিক আব্দুল আলিম ও আব্দুল জলিল। সব মিলিয়ে এই ঘটনায় প্রায় ১০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির তথ্য অডিও ও কলরেকর্ড সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
২৩ ডিসেম্বর এসআই আমিরুল ইসলাম বাদী হয়ে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা ১৫০ জনকে আসামি করে মামলা (নং-২৪) দায়ের করেন। তবে এই তালিকায় উঠে এসেছে অদ্ভুত সব অসঙ্গতি।
স্থানীয় বাসিন্দা হাজী মশাহিদ ও জসীম উদ্দিন জানান, ইউপি সদস্য কাজল সিংহের কথা বিশ্বাস করে তারা পুলিশের তালিকায় স্বাক্ষী হিসেবে দস্তখত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন মামলার কপিতে তারা নিজেদের নাম আসামির তালিকায় দেখতে পান। স্থানীয় বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার দুই ভাইয়ের ওই এলাকায় কোনো জমি নেই। অথচ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ইশারায় তাদের আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগের আঙুল উঠেছে এসআই সিকান্দার, কথিত দুই সাংবাদিক এবং ইউপি সদস্য কাজল সিংহের দিকে। লুটপাটকারী সিন্ডিকেটের এক বালু ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দিনের আলোতে সরঞ্জাম ও ম্যানেজার ধরা পড়ায় নিরুপায় হয়ে পুলিশ ও সিন্ডিকেটকে টাকা দিয়ে রফাদফা করতে হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ইউপি সদস্য কাজল সিংহ বলেন, আমি ওসির নির্দেশে স্বাক্ষী হয়েছি। টাকা পয়সা নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। আমি শুধু অনুরোধ করেছি যেন নিরপরাধ কেউ ফেঁসে না যায়।
শান্তির বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও জেলা যুবদলের সহ সাধারণ সম্পাদক বাহার আহমেদ রুহেল জানান, জাতির দর্পণ নামে খ্যাত কতিত কিছু সাংবাদিকদের কারণে আজ এমন ঘটনা। এ জুলুমের শেষ কোথায়! আল্লাহ সহ্য করবেননা। কে সেই সাংবাদিক জানতে চাইলে এটা সবার জানা নাম ধরতে হবেনা। তারা এই ‘জুলুম’ ও পুলিশি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদীন বলেন, আফসোস কালাইরাগ বালু মহালে আমাদের কোন জায়গা নেই। তারপরও আমার দুই সহোদর মামলার আসামী। কে বা কারা প্রভাবশালীদের আঁতাত করে এতবড় ঘঠনার জন্ম দিলো জানতে চাইলে তিনি বলেন মূল নাটের গুরু হিসেবে কপিয় অসাধু পুলিশ, সাংবাদিক আব্দুল আলিম, আব্দুল জলিল ও ফখর উদ্দিন, স্থানীয় মেম্বার ও প্রভাবশালী । এবং এই মামলায় নাম না ডুকাতে কয়েক লাখ টাকার চাঁদাবাজি করেছে এই সিন্ডিকেট।
এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সালিশান ব্যক্তি আব্দুল আজিজের সাথে প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে এলাকা সম্পূর্ণ রেকর্ডীয় সম্পত্তি, ভূমি অফিসে সরকারের কাছেই সবার নাম লিপিবদ্ধ অথচ এলাকার নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামী করা হয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোকে নিরপরাধ ব্যক্তিদের অব্যাহতি ও বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিময়ে মামলা বাণিজ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে উর্ধতন কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সিলেট-৪ আসনের দুই এমপি প্রার্থী বিএনপির আরিফুল হক চোধুরী ও জামায়াতের জয়নাল আবেদিন সাহেবকে অবহিত করেছি।
কোম্পানীগঞ্জ প্রেসক্লাবরে একাংশের সভাপতি আব্দুল আলিমের মুটোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায় তবে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করেন।
ঘটনার বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. সিকান্দার আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেন। তবে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং জব্দকৃত ট্রাক, ট্রাক্টর ও পেলোডার আটকের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তিন লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। এত দ্রুত আসামিদের নাম ও ঠিকানা কীভাবে পেলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, "মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে কেউ নিরপরাধ প্রমাণিত হলে তিনি অব্যাহতি পাবেন।"
মামলার বাদী এসআই আমিরুল ইসলাম জানান, ওসি মহোদয়ের নির্দেশে ঘটনাস্থলে থাকার কারণে তিনি এই মামলায় বাদী হয়েছেন। তবে অভিযোগের একটি বড় অংশ—অর্থাৎ ঘটনাস্থলের সাক্ষীদের কেন আসামি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারেননি এবং বিষয়টি তার জানা নেই বলে দাবি করেন।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, অবৈধ বালি ও পাথরের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। ঘটনার দিন তিনি সরেজমিনে উপস্থিত থেকে নিয়মিত মামলা রুজু করেছেন বলে জানান। তবে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। ঘটনাস্থলে থাকা ট্রাক বা ফেলোডার জব্দের বিষয়ে তিনি বলেন, "সেদিন কোনো যানবাহন জব্দ করা হয়নি, বরং ফেলোডার দিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলনকৃত বালু নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।"
সার্বিক বিষয়ে সিলেট জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা মো. সম্রাট তালুকদার জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পুলিশের কোনো কর্মকর্তা যদি অনিয়মের সাথে জড়িত থাকেন, তবে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীরা বর্তমান সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী ও সিলেটের পুলিশ সুপারের কাছে এই ‘মামলা বাণিজ্য’ বন্ধ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধীদের অব্যাহতির দাবি জানিয়েছেন।