জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা শিশু-তরুণ-বৃদ্ধ-যুবক-যুবতী সবার জন্য এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেই দেশ নিয়ে সবাই গর্ব করে বলবে আমি বাংলাদেশি। নারী-পুরুষ সবাই মিলেই বৈষম্য-চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত নিরাপদ, মানবিক আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
তিনি বলেন, আমরা ঘোষণা দিয়েছি যে, আমরা চাঁদা নেব না, কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেব না। আমরা দুর্নীতি করবো না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না। ইনসাফকে আর টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হবে না। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবীদের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ১০ দলের প্রার্থীদের প্রতীকে ভোট এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। এই বিজয় কোনো পরিবার বা গোষ্ঠীর হবে না, এ বিজয় হবে জনসাধারণের।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে আদর্শ স্কুল মাঠে আয়োজিত নিজ নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এই সমাবেশের মধ্য দিয়ে তিনি নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন তিনি। বিকেল তিনটার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসভা শুরু হলেও দুপুরের পর থেকেই দাঁড়িপ্লার শ্লোগান দিয়ে খন্ড খন্ড মিছিল নিয়ে মাঠে জড়ো হন জামায়াত নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ। একপর্যায়ে মানুষের উপস্থিতি মাঠ পেরিয়ে আশপাশের সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় দাঁড়িপাল্লা পক্ষে ব্যানার ফেস্টুনে ছেয়ে যায় গোটা এলাকা।
জনসভায় বক্তব্যে বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন কার্ড বিতরণের দিকে ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, আমরা কোনো কার্ডের ওয়াদা করছি না। দুই হাজার টাকার কার্ডে কোনো পরিবারের সমস্যার সমাধান হবে না। এতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হবে।
তিনি বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দেশ চলে। এর বাইরে বেসরকারি একটি ট্যাক্স আছে, গরীব, ভিক্ষুক থেকে শুরু করে সবার কাছ থেকেই এই ট্যাক্স নেওয়া হয়। ওই ট্যাক্স বন্ধ করতে হবে। ওই ট্যাক্স নামের চাঁদাবাজি আর চলবে না।
জামায়াত আমির বলেন, সমাজে সব ধরণের বৈষম্য-দুর্নীতি সন্ত্রাসের কারণ ইনসাফ না থাকা। ইনসাফ থাকলে দুর্নীতিবাজ, লুটেরা, ব্যাংক ডাকাতরা নিরাপদে পালাতে পালানোর সুযোগ পেতেন না, বেগমপাড়া বানাতে পারতেন না, বাংলাদেশকে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে পারতেন না।
তিনি বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে গোটা দেশকে রক্তে লাল দেশে পরিণত করেছিল। ইতিহাসের কলঙ্ক আয়নাঘর গড়ে তুলেছিল। সেই আয়নাঘর থেকে সেনা কর্মকর্তা, উচ্চ আদালতের আইনজীবীও রক্ষা পাননি। অনেককে এখনো তার স্বজনরা ফেরত পাননি। সম্ভবত তারা আর দুনিয়াতে নেই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সবার জন্মভূমি। এখানে আর কোনো ফ্যাসিবাদের ছায়াও দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ নতুন জামা পরে এলেও একই পরিণতি হবে।
তিনি বলেন, বিগত তিন নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ভোট ডাকাতি হয়ে গেছে। নতুন করে কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চাই না। তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, চব্বিশের তরুণদের বিপ্লবের কারণে আমরা কথা বলতে পারছি। তাদের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ন্যায় চিবার-ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তোমরা ঘরে ফিরে যাবে না। আমরা তাদের সঙ্গে আছি। যারা মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হত্যার রাজনীতি থেকে নিজেদের কর্মীকে রক্ষা করতে পারবে না, তারা আগামীর বাংলাদেশ রক্ষা করতে পারবে না। তারা যত স্বপ্নই দেখাক না কেন, তাদের ক্ষমতায় আসার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
জামায়াত আমির বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি মানুষ দুটি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে মুখিয় আছে। একটি হলো গণভোটের হ্যাঁ। আরেকটি হলো দেশের স্বার্বভৌমত্ব, সবার অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনের মাঠে এসে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ের মাধ্যমে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, ডাকাত, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট।
এ সময় তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের হাতে প্রতীকী শাপলা কলি এবং ঢাকা ১২, ১৪, ১৬ ১৭ আসিনে জামায়াত প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের বিজয়ী করার আহ্বান জানান।
নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ আসনের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, আমরা সব ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়ে সব সমস্যার সমাধান করবো, যেটা করতে পারবো না সেটা এবং কেন দেরি হচ্ছে তা স্পষ্ট করবো। আমি বিজয়ী হলে এই এলাকায় মান সম্মত হাসপাতাল, বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মনিপুর স্কুলকে বিশ্বমানের করার চেষ্টা করবো। বাকি সমস্যা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমাধান করবো।
তিনি বলেন, আমি এখানে জামায়াতের আমির হিসেবে নয়, সব বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পক্ষ হয়ে দাড়িয়েছি। সবার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যাদের কারণে চব্বিশের বিপ্লব হয়েছে, তাদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হয়নি। শহীদ শরিফ ওসমান হাদীকে হত্যা তার প্রমাণ। সে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ও মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলত। যারা এটা চায় না, তারাই তাকে শেষ করে দিয়েছে। ১৮ কোটি মানুষের অন্তরে এখন হাদি। তার স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই থামাবো না।
তিনি বলেন, আমরা তরুণদের প্রফেশনাল ও নৈতিক শিক্ষা দিতে চাই। যে শিক্ষা সার্টিফিকেট নয়, দক্ষতা তৈরি করে চাকরি নিশ্চিত করে।
তিনি বলেন, মায়েদের সম্মান রক্ষা করতে চাই। তাদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল, নিরাপদ রাস্তাঘাট নিশ্চিতে যা যা করার সব কিছুই করব। যারা আজেবাজে কথা বলে, মা-বোনরা তাদের উপযুক্ত জবাব নির্বাচনের মাধ্যমে দিতে প্রস্তুত। মায়েদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি বরদাশত করা হবে না।
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ঢাকা ১৫ বাসীর সৌভাগ্য যে, জামায়াতের আমির এই আসন থেকে নির্বাচন করছেন। তিনি তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের কান্ডারী। সারাদেশে তার পক্ষে যে জনজোয়ার নেমে এসেছে, তা ১২ ফেব্রুয়ারি দেখা যাবে।
তিনি সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবশ্যই সুষ্ঠু হতে হবে। অন্য কোনো প্লান কাজে দেবে না। নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ হতে হবে। কোনো বৈষম্য মানা হবে না। আমাদেরকে মাঠে নামতে বাধ্য করবেন না।
বিএনপির বিভিন্ন কার্ড দেওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, কার্ড পাক, কিন্তু জনগণ পর্যন্ত এটা পৌঁছাবেতো? ঘুষ দেওয়া লাগবে নাতো? একদিকে কার্ড দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্য দিকে ঋণখেলাফিদের প্রার্থী করা হচ্ছে। নতুন কোনো লুটেরাদের ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হবে না। তিনি ১০ দলীয় জোটের মার্কাকে জয়ী এবং হ্যাঁ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় শিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, সারাদেশে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নতুন ভোর আসবে ইনশাআল্লাহ।
ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালক আব্দুর রহমান মুসার সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্র্রীয় নেতা মাওলানা তাওহিদুজ্জামান, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী ব্যারিস্টার আহমেদ বিনা কাশেম আরমান, কর্ণেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নেতা মুফতি আহসান উল্লাহ কাসেম, ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান, ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী কর্ণেল (অব.) আব্দুল বাতেন, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ সভাপতি লস্কর মো: তসলিম, কাফরুল থানার নেতা আনোয়ারুল করিম, আব্দুল মতিন খান, রেজাউল করিম মাহমুদ, জুলাইযোদ্ধা কাজী সাইফুল ইসলাম ও শহীদ আব্দুল হান্নানের ছেলে ডা. সাইফ আহমেদ খান।
সূত্রমতে, ঢাকার এই জনসভার মধ্য দিয়ে জামায়াত আমিরের টানা চার দিনের নির্বাচনি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শুক্রবার থেকে তিনি উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সফর করবেন। ২৫ জানুয়ারি ফের তিনি ঢাকায় নির্বাচনি বিভিন্ন আসনে গণসংযোগ করবেন।