বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ভোট একটি আমানত এবং এই আমানতকে উপযুক্ত ও সৎ ব্যক্তির হাতেই দিতে হবে। খেয়ানতকারীর হাতে ভোটের আমানত তুলে দিলে সেই খেয়ানতের দায় ভোটারদের ওপরও বর্তায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ভোট মানেই শক্তি। একজন রিকশাচালকের ভোটের মূল্য যেমন, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রপতির ভোটের মূল্যও সমান। একটি ভোটেই কেউ জেতে, একটি ভোটেই কেউ হারে। তাই এই শক্তি যদি বেনামাজি, অসৎ, চাঁদাবাজ, মাস্তান কিংবা নেশাখোরের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই শক্তি ব্যবহার করে তারা চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, চাল-গম ও ত্রাণের টাকা লুটপাট এবং জনগণের ওপর জুলুম চালাবে। তিনি বলেন, আমার দেওয়া ভোটের কারণে যদি কেউ এই ক্ষমতা পেয়ে চুরি, দুর্নীতি ও অন্যায়ের সঙ্গে জড়ায়, তাহলে সেই গুনাহের অংশীদার আমিও। বিপরীতে, আল্লাহভীরু, দ্বীনদার ও সৎ মানুষকে ভোট দিয়ে দায়িত্বে বসালে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন, আর সেই নেকির ভাগ ভোটাররাও পাবেন—এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যাও দেন তিনি।
সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদ হচ্ছে দেশের আইনসভা। ৩০০ জন সংসদ সদস্য যে আইন তৈরি করবেন, সেই আইন দিয়েই দেশ চলবে এবং তারাই প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব নির্ধারণ করবেন। যদি ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫০টির বেশি আসনে সৎ, নামাজি ও আল্লাহভীরু মানুষ পাঠানো যায়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) দিনব্যাপী খুলনা-৫ আসনে ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভোটার সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
সকাল ৮টায় মাগুরখালী ওয়ার্ড প্রতিনিধি সমাবেশ ইউনিয়ন সভাপতি মাওলানা সুবহানের সভাপতিত্বে এবং হিন্দু কমিটির ইউনিয়ন সভাপতি গৌতম মণ্ডলের পরিচালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বক্তব্য দেন জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, ডুমুরিয়া উপজেলা আমির মাওলানা মোক্তার হোসেন, নায়েবে আমির গাজী সাইফুল্লাহ ও মাওলানা হাবিবুর রহমান, সেক্রেটারি আব্দুর রশীদ বিশ্বাস, উপজেলা হিন্দু কমিটির সেক্রেটারি অধ্যক্ষ দেব প্রসাদ মণ্ডল, সুজিত মণ্ডল, বিকানন্দ বৈরাগী, সনাতন সানা, উজ্জ্বল সাধু, দেবাশীষ বিশ্বাস, বিজয় সরকার, নিমাই চাঁদ রায়, অনিল সানা, প্রীতিশ মণ্ডল, বিষ্ণুপদ মণ্ডল প্রমুখ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এবার জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলামসহ ছয়টি ইসলামী দল এবং আরও ছয়টি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল—মোট ১২টি দল একযোগে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তাদের কেউই বুক চিতিয়ে বলতে পারেনি যে তারা চুরি, দুর্নীতি ও জুলুমমুক্ত শাসন দিয়েছে—এমন অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এতদিন আলেম-ওলামাদের শুধু মসজিদ, মাদরাসা, জানাজা ও ইমামতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এবার আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি—যারা মসজিদের ইমাম হবে, তারাই রাষ্ট্রেরও ইমাম হবে; যারা জানাজার ইমাম হবে, তারাই পার্লামেন্টেরও ইমাম হবে।
তিনি কুরআনের সূরা আরাফের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, কোনো জাতি যদি ঈমান এনে আল্লাহকে ভয় করে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাহলে আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর সব বরকতের দরজা খুলে দেন। “আমরা সেই বরকতের বাংলাদেশ চাই,” বলেন তিনি। তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দোদুল্যমান ভোটারদের বোঝাতে ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে কথা বলতে হবে। দল-মত ভুলে অন্তত একবার দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। একই সঙ্গে নারী ভোটারদেরও সচেতন করার আহ্বান জানান।বক্তব্য শেষে তিনি দেশবাসীর জন্য দোয়া কামনা করেন এবং বলেন, আল্লাহ যেন দেশের সব কাজকে ইবাদত হিসেবে কবুল করেন এবং জাতিকে খেয়ানত থেকে রক্ষা করেন। তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, তাদের চরিত্র, সততা ও আদর্শের পরীক্ষা হয়ে গেছে এবং তারা সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। তাই ফেল করা শক্তিকে আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব না দেওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সকাল ৯টায় উলা ৩নং ওয়ার্ড মহিলা সহযোগী সদস্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং বেলাল হোসাইন রিয়াদের পরিচালনায় বক্তব্য দেন জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, সরদার আবদুল ওয়াদুদ, মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম আল ফয়সাল, উপজেলা নায়েবে আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান, মাওলানা আজহারুল ইসলাম প্রমুখ।
সকাল ১০টায় উলা সরদারপাড়া ইউনিটের সহযোগী সদস্য সম্মেলন মাস্টার লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে এবং ইউনিট সভাপতি নুরুল ইসলাম সরদারের পরিচালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বক্তব্য রাখেন জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা ওবায়দুর রহমান, খুলনা জেলা উত্তর ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মোমিনুর রহমান, থানা সভাপতি আবু তাহের প্রমুখ।
সকাল ১১টায় মইখালী সহযোগী সদস্য সম্মেলন মেহের আলী সরদারের সভাপতিত্বে এবং যুবনেতা আলমগীর হোসেনের পরিচালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। এতে বক্তব্য দেন জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবু ইউসুফ মোল্লা, ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি ডা. হরিদাস মণ্ডল, সহসভাপতি অ্যাডভোকেট অশোক সিংহ, বিএল কলেজের ভিপি অ্যাডভোকেট শেখ জাকিরুল ইসলাম, অধ্যক্ষ দেব প্রসাদ মণ্ডল প্রমুখ।
বিকেল ৪টায় বান্দা হিন্দু সদস্য সমাবেশ ভাণ্ডারপাড়া ইউনিয়ন সভাপতি ডা. নিত্য রঞ্জন রায়ের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। এতে বক্তৃতা করেন ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি ডা. হরিদাস মণ্ডল, উপজেলা সহসভাপতি অ্যাডভোকেট অশোক কুমার সিংহ, উপজেলা সেক্রেটারি অধ্যক্ষ দেবপ্রসাদ মণ্ডল, ডা. সুজিত সরকার, ইউনিয়ন আমির মাওলানা কামরুল ইসলাম, ইউনিয়ন সেক্রেটারি মাওলানা আসাদুজ্জামান, মাওলানা আইয়ুব আলী, ইউপি সদস্য মলয় বিশ্বাস, প্রীতিশ মণ্ডল, সঞ্জয় মণ্ডল, দুর্গা দাস বিশ্বাস, রুইদাস মণ্ডল প্রমুখ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে—এমন প্রচারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। তিনি দাবি করেন, ইসলামের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার ঘরে কল্যাণ বয়ে আনবে।
তিনি বলেন, হিন্দু ভাইদের ভয় দেখানো হচ্ছে—দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে ধর্ম পরিবর্তন হয়ে যাবে, মেয়েরা বাইরে বের হতে পারবে না। এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমাদের এলাকায় হিন্দু অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও কমিউনিটি নেতারা দায়িত্বে আছেন। তারা স্বাধীনভাবেই নিজ নিজ ধর্ম পালন করছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াত বা ইসলামী আন্দোলনের কোনো লোক কখনো হিন্দুদের বাড়ি দখল করে না, মিথ্যা মামলা দেয় না, জমি বা ঘের দখল করে না। বরং এসব কাজ যারা করেছে, তারা গত ৫৪ বছর ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বর্তমান ও অতীত শাসকদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ৫৪ বছরে দেশ পরিচালনাকারীদের চরিত্র, সততা ও আদর্শের পরীক্ষা হয়ে গেছে। তারা সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। এই ফেল করা শক্তিকে আমরা আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চাই না।
তিনি আরও বলেন, এতদিন আলেম-ওলামাদের শুধু মসজিদ ও মাদরাসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এবার পরিবর্তন আসবে। আমরা শুধু মসজিদে ইমামতি করব না, পার্লামেন্টেও ইমামতি করব। সৎলোক যদি রাষ্ট্র চালায়, দেশ অবশ্যই ভালো হবে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হিন্দুরা হিন্দুই থাকবে, তাদের পূজা-পার্বণ তারা করবে। ইসলামের সুশাসন হলে সেই ন্যায়বিচার হিন্দুর ঘরেও যাবে, মুসলমানের ঘরেও যাবে। তিনি দাবি করেন, এখন অনেক হিন্দু ভোটার বিষয়টি বুঝতে শুরু করেছেন।
সমাবেশে তিনি ঘৃণা ও বৈষম্যের রাজনীতির বিরোধিতা করে বলেন, সৎ মানুষ শুধু মুসলমানদের মধ্যেই নেই, হিন্দুদের মধ্যেও সৎ লোক আছে। অন্যায় ও পাপকে যারা ঘৃণা করে, তাদের সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্ব।