স্পিকার নির্বাচনের পর স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে। দিনের কার্যসূচির শুরুতেই শোকপ্রস্তাব উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে যায় সংসদ। প্রথম দিনের অধিবেশনে খালেদা জিয়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহত এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন বিশিষ্টজনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের কথা আগে থেকেই কার্যসূচিতে ছিল। পরে চিফ হুইপ জামায়াতের নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ ও দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর নাম শোক প্রস্তাবে যুক্ত করার প্রস্তাব করেন। যা স্পিকার গ্রহণ করেন।
বৃহস্পতিবার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন এবং শোকপ্রস্তাব উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সংসদের প্রথম দিনের কার্যক্রম সাজানো হয়। এর আগে জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে দিনের প্রথম ভাগে অধিবেশন শুরু হয়। পরে স্পিকার পদে হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার পদে কায়সার কামাল নির্বাচিত হন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য মুলতবি করা হয়। বিরতিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। পরে মাইক বিভ্রাট ও নামাজের বিরতির পর বেলা দেড়টার দিকে আবার অধিবেশন শুরু হয় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে। অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর সংসদে একে একে শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
প্রথম দিনের এই অধিবেশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাবেক রাষ্ট্রপতি, বহু সাবেক সংসদ সদস্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তি এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব আনা হয়।
সংসদে উপস্থাপিত শোকপ্রস্তাবে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের দুবারের বিরোধী দলীয় নেতা, মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী ও গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন’ বেগম খালেদা জিয়াকে হারিয়েছে দেশ। প্রস্তাবে বলা হয়, তার মৃত্যুতে ‘মহান জাতীয় সংসদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছে।’
একই অধিবেশনে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে পৃথক শোকপ্রস্তাব আনা হয়। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতিসহ ৬২ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের প্রস্তাবও সংসদে উপস্থাপন করা হয়।
তালিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ফরহাদ আহমেদ চৌধুরী, শহীদুল্লাহ শহীদ, অ্যাডভোকেট মো. নাদিম মোস্তফা, অধ্যাপিকা নূরুন নেসা হোসেন, মো. মাহবুবুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, মতিয়া চৌধুরী, শহিদুজ্জামান বেল্টু, রওজি কবির, এস এম আকরাম, মেজর জেনারেল অব. কে এম সফিউল্লাহ, আবদুল মোমিন তালুকদার, আবদুল্লাহ আল নোমান, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, কর্নেল অব. এম আনোয়ারুল আজিম, মখদুমা মহিউদ্দিন মিঠু, মো. আবদুল মান্নান তালুকদার, ইফতিখার উদ্দিন তালুকদার পিন্টু, মো. হাফেজ মুহাম্মদ আমিন মাদানী, বোরহান উদ্দিন, শহিদার হাসান তারেক, মেজর জেনারেল অব. মাহমুদ হাসান, রমেশ চন্দ্র সেন, মিরা আজমত, মো. গোয়েশ্বর হোসেন, জিয়াউদ্দিন বাবলু এবং সুকুমার রঞ্জন ঘোষসহ অন্যদের নাম রয়েছে।
সংসদে উপস্থাপিত আরেক শোকপ্রস্তাবে ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের অগাস্ট পর্যন্ত গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিহতদের স্মরণ করা হয়। সেখানে বলা হয়, গুম, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গোপন ও ক্রসফায়ারের নামে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন বহু মানুষ।
একই প্রস্তাবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদ, বীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শহীদমিয়া জননী, মেহেদী হাসান জুনায়েদ এবং ফাইয়াজসহ আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতিও শোক জানানো হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, গত ১১ জুলাই ২০২৫ উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে বহু মানুষ নিহত হন। ওই ঘটনায় আহতদের মধ্যে অনেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সংসদ তাদের প্রতিও শোক প্রকাশ করে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট নুসরাত শারমিন মোরী, উপপরিচালক রিপোর্টিং মোহাম্মদ হুসান, সহকারী পরিচালক গণসংযোগ মাহফুজা বেগম এবং অফিস সহায়ক মো. আব্দুল লতিফের মৃত্যুতে আলাদা শোকপ্রস্তাব আনা হয়।
শোকপ্রস্তাবে দেশের সাংস্কৃতিক, শিক্ষাবিষয়ক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও নাগরিক অঙ্গনের আরও অনেক বিশিষ্টজনের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন শাফিন আহমেদ, অধ্যাপক আবু জাফর, এ কে হাসান আরিফ, প্রবীর মিত্র, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, ইমান আলী আহমেদ চৌধুরী, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, শহীদ রফিক, সুষমা দাশ, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, হামিদুজ্জামান খান, হাসান আবিদুর রেজা জুয়েল, অধ্যাপক এম শমশের আলী, মতিন সরকার, ফরিদা পারভীন, আহমদ রফিক, অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, বিচারপতি আব্দুর রউফ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, এম হাফিজ উদ্দিন খান এবং কানিজ ফাতেমা।
প্রস্তাবে বলা হয়, উপস্থাপিত শোকপ্রস্তাবগুলোর বাইরে যদি কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের নাম বাদ পড়ে থাকে, তবে তাদের নাম ও সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত সংসদ সচিবালয়ে পাঠালে পরবর্তীতে শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।