আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি ও এর সঙ্গে যুক্ত গণভোট প্রক্রিয়া নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি ভোটারদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও উদ্বেগ। প্রায় ১৫ হাজার প্রবাসী ভোটার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন এবং ইতোমধ্যে অনেকের ঠিকানায় পোস্টাল ব্যালট পেপার পৌঁছেছে।
তবে ব্যালট পেপার পাঠানো, গ্রহণ ও ফেরত দেওয়ার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা এবং ভোটারের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রবাসীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে জামায়াত নেতার বাসায় বিপুলসংখ্যক পোস্টাল ব্যালট থাকার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
প্রবাসী ভোটারদের অভিযোগ, একটি রাজনৈতিক দলের নেতার বাসায় কীভাবে ব্যালট পৌঁছেছে— তা নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলছে। এতে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার ওপর আস্থা সংকটে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক ভোটার।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালটে একসঙ্গে ১১৮টি প্রতীক এবং পাশাপাশি গণভোটের প্রশ্ন যুক্ত থাকায় ব্যালট জটিল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন প্রবাসীরা। এতে ভুল ভোট দেওয়া বা ভোট বাতিল হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
সিডনির বাসিন্দা ভোটার রুহেল আহমদ বলেন, “ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে। কিন্তু ব্যালট হারিয়ে গেলে বা ভুল হলে আমার ভোটের মূল্য থাকবে না। ১১৮টি প্রতীক থাকায় পুরো প্রক্রিয়াই জটিল মনে হচ্ছে।”
নাজমিন নামে আরেক নারী ভোটার বলেন, “রেজিস্ট্রেশন করেছি, কিন্তু ব্যালট কোথায় যাচ্ছে, কে গ্রহণ করছে— এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই।”
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হায়দার আলী পোস্টাল ভোট ব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে অনিয়ম ও প্রভাবমুক্ত রাখতে সবাইকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যালট পূরণ ও প্রেরণের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের প্রতি সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তবে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতা। তাদের মতে, সংগঠিতভাবে ব্যালট সংগ্রহ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। বাহরাইনে একটি রাজনৈতিক দলের নেতার বাসা থেকে পোস্টাল ব্যালট উদ্ধারের অভিযোগ এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি আইনজীবী ড. মো. সিরাজুল হক বলেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার অপচেষ্টা চলছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
নির্বাচন ও আইন বিশ্লেষকদের মতে, পোস্টাল ভোট ও গণভোট একসঙ্গে চালুর ফলে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রসারিত হলেও এর সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। ১১৮ প্রতীক, ব্যালট ব্যবস্থার দুর্বল নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক পরিসরে ওঠা অভিযোগ মিলিয়ে এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতের গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশনা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিমূলক ব্যালট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে পোস্টাল ভোট ও গণভোট নিয়ে আস্থা সংকট আরও গভীর হবে।