বেনজীর আংকেল কট খাওয়ার এই দিনে, সিডনিতে তাকে সংবর্ধনাদানকারীদের কথা মনে পড়ে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো এমন একটি পোস্টই নতুন করে আলোচনায় এনেছে বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে। দুবাইয়ে তাঁকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠক বা সংবর্ধনার ছবি নিয়ে কমিউনিটির সবত্র আলোচনাসহ সামাজিক মাধ্যমে আবারও ভাইরাল হয়েছে।
সেই ছবিকে কেন্দ্র করে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি মাঝে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা, বিতর্ক ও নানা প্রশ্ন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পরিবেশবাদী লেখিকা ড. নার্গিস বানুও এ বিষয়ে একাধিক ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে বেনজির ইস্যুতে আবার নতুন বিতর্ক এবং আলোচনায় সৃষ্টি হয়েছে।
এক পোস্টে তিনি লিখেছেন,অবশেষে বেনজীরকে নাকি দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। সত্য উদঘাটন হলে ফেঁসে যেতে পারে কমিউনিটির কিছু পরিচিত মুখ। অন্য এক পোস্টে তিনি লেখেন, বেনজীরের নামে অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে মহিলাসহ ২-১টা সাদা মানুষ নিয়ে সেই একই এইডের ধান্দাবাজি শুরু। সাবধান!” পরে মন্তব্যে তিনি আরও লেখেন,বেনজীরকে সেবাদানকারী সিডনির চক্রটি এখন দেশে বিএনপির নেতাদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ড. নার্গিস বানুর এসব পোস্টের নিচে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। কেউ সংশ্লিষ্টদের পরিচয় প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন, আবার কেউ বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
জানা গেছে, একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তাদের একজন হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদ বর্তমানে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আলোচিত। দেশে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরেই তিনি পরিবার নিয়ে পালিয়ে বিদেশে বসবাস করেছিলেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া,দুবাই ও পর্তুগাল হয়ে বেনজীর আহমেদ পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছিলেন।
প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সিডনিতে তাঁর একটি ব্যক্তিগত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের একটি ছবিও সে সময় প্রকাশিত হয়।
সূত্র জানায়,২০২৪ সালের ৩১ মার্চ ও ২ এপ্রিল বেনজীর আহমেদকে ঘিরে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তিনি প্রথমে সিঙ্গাপুরে যান। পরে মালয়েশিয়ায় ‘মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম’ কর্মসূচির আওতায় কেনা একটি বাড়িতে অবস্থান করেন। সেখান থেকে দুবাই ও পর্তুগাল হয়ে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস শুরু করেছিলেন । ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চেঞ্জ ডট ওআরজি-তে “ইনভেস্টিগেট অ্যান্ড ডিপোর্ট বেনজীর আহমেদ ফ্রম সিডনি” শিরোনামে একটি পিটিশন চালু করা হয়। স্বাধিন বাংলা পডকাস্টের পক্ষে তৌহিদ হোসেনের উদ্যোগে প্রকাশিত ওই আবেদনে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
পিটিশনে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ, নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং গণমাধ্যমের প্রতি বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগে জমা দেওয়া তথ্য অধিকার-সংক্রান্ত নথিতেও বেনজীর আহমেদকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে প্রায় ৪৩ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে।
এর মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামে প্রায় ৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা, স্ত্রী জীশান মির্জার নামে প্রায় ২১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, বড় মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীরের নামে প্রায় ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ছোট মেয়ে তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের নামে প্রায় ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য উঠে আসে।
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে ঢাকার গুলশানে বেনজীর পরিবারের মালিকানাধীন চারটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট তালাবদ্ধ অবস্থায় থাকার বিষয় গুলো ততকালীন সময়ে আলোচনায় আসে। এছাড়া ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও আলোচিত হয়।
প্রবাসী কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আবিদুর রহমান বলেন,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কমিউনিটির আলোচনায় রয়েছে,অতীতে বেনজীরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সিডনিতে বসবাসকারী কিছু ব্যক্তি বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক ছায়াতলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর গ্রেফতারের খবরে তৎকালীন সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় বেনজীর আহমেদের অবস্থান,তাঁর যোগাযোগ এবং আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে যে আলোচনা চলছে,সেগুলো নিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো অনুসন্ধান চালালে প্রকৃত তথ্য বের করা সম্ভব।
শাহিন আহমদ নামের এক প্রবাসী বলেন, বেনজীর ইসু্তে কমিউনিটিতে যেসব আলোচনা চলছে,সেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও সামনে আসা প্রয়োজন। এতে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
প্রবাসী কমিউনিটি নেতা শিপন আহমদ বলেন,বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার ও তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যেসব অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে অাসার পর প্রবাসীদের মাঝে তাঁর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান ও যোগাযোগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে বেনজিরবএর অনুসারী একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক এখানেও সক্রিয় রয়েছে।
বেনজীর আহমেদকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত কয়েকজন ব্যক্তির অতীতের সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিষয়গুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
অস্ট্রেলিয়ায় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হায়দার আলী বলেন,বাংলাদেশে বেনজীর আহমেদকে ঘিরে যেসব তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে,তার পর প্রবাসী সমাজে তাঁর যোগাযোগ ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। সাবেক আইজিপি বেনজীরের অস্ট্রেলিয়ায় কালো টাকা পাচারের বিষয়সহ বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট সরকার আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনামলে অনেক সংসদ সদস্য ও শাসনের নামে নিরপরাধ মানুষ হত্যায় জড়িত প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীরা, যাঁরা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন অস্ট্রেলিয়ায় এসে ভিন্ন কৌশলে কালো টাকাকে সাদা করার পাশাপাশি সগৌরবে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন এবং দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। সিডনিস্থ বাংলাদেশি কমিউনিটির দাবি, যাঁরা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁরা এখন অস্ট্রেলিয়ায় এসে বাইরে সাধু সাজার চেষ্টা করছেন। তাঁদের আইনগতভাবে শনাক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য অস্ট্রেলিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এটি এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সচেতন মহলের অনেকে জানান,বেনজীর আহমেদকে ঘিরে বিতর্ক এখন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এটি এখন আর শুধু বাংলাদেশের একজন সাবেক অাইজিপি বা পুলিশ কর্মকর্তার বিষয় নয়;বরং ক্ষমতা,জবাবদিহি ও প্রবাসী রাজনীতির নানা প্রশ্নও এখন সবত্র অালোচনার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিনত হয়েছে।