ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসি’র চট্টগ্রাম পোর্ট শাখা থেকে জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকা ঋণ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং তার স্ত্রী ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মোট ৩৬ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চার্জশিট দাখিল করেছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক হাসানুল ইসলামের আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জশিটটি দাখিল করেন। আদালত চার্জশিট গ্রহণের বিষয়টি নথিভুক্ত করে আগামী ৭ জানুয়ারি শুনানির দিন ধার্য করেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) রেজাউল করিম রনি। তিনি বলেন, আজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। আদালত আগামী ৭ জানুয়ারি শুনানির দিন নির্ধারণ করেছেন।
এর আগে রোববার (৪ জানুয়ারি) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে আলোচিত এই মামলার চার্জশিট অনুমোদন দেওয়া হয়।
দুদকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই সংস্থাটির উপ-পরিচালক মশিউর রহমান খান বাদী হয়ে দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করেছিলেন। মামলায় ৩১ জনকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্তে আসামির সংখ্যা বেড়ে ৩৬ জনে দাঁড়ায়।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি’র পোর্ট শাখা, চট্টগ্রাম ও প্রধান কার্যালয়, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধ সংঘটিত হয়।
চার্জশিট ভুক্ত আসামিরা হলেন—সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান, ইউসিবি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আরিফ কাদরী, ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বজল আহমেদ বাবুল, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান এমএ সবুর, ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ইউনুছ আহমদ, হাজী আবু কালাম, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আসিফুজ্জামান চৌধুরী, রোকসানা জামান চৌধুরী, বশির আহমেদ, আফরোজা জামান, সৈয়দ কামরুজ্জামান, মো. শাহ আলম, মো. জোনাইদ শফিক, অপরূপ চৌধুরী ও তৌহিদ সিপার রফিকুজ্জামান, ইউসিবি ব্যাংকের পোর্ট শাখার সাবেক সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ, শাখার সাবেক শাখা প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ চৌধুরী, সাবেক ক্রেডিট অফিসার জিয়াউল করিম খান, সাবেক এফএভিপি ও অপারেশন ম্যানেজার মীর মেসবাহ উদ্দীন হোসাইন, আরামিট পিএলসির প্রটোকল অফিসার ও ভিশন ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহ চৌধুরী, আরামিট পিএলসির কর্মী ও মডেল ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মিছবাহুল আলম, আরামিট পিএলসির এজিএম ও ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক মো. আব্দুল আজিজ, আরামিটের এজিএম ও ক্লাসিক ট্রেডিংয়ের মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, আরামিটের কর্মচারী মোহাম্মদ হোসাইন চৌধুরী, মো. ইয়াছিনুর রহমান, কর্মচারী মো. ইউছুফ চৌধুরী ও মো. সাইফুল ইসলাম।
মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন আরামিট লিমিটেডের প্রোটোকল অফিসার মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহ চৌধুরীকে ব্যবসায়ী সাজিয়ে ‘ভিশন ট্রেডিং’ নামীয় একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী দেখানো হয়। মিথ্যা তথ্য ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে ১৩ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে ইউসিবি পোর্ট শাখায় একটি চলতি হিসাব খোলা হয়।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, শাখার সিনিয়র কর্মকর্তা আকরামউল্লাহ এবং তৎকালীন শাখা প্রধান ও ডেপুটি প্রিন্সিপাল কর্মকর্তা আবদুল হামিদ চৌধুরী কোনও প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে হিসাবটি অনুমোদন দেন।
পরে ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভিশন ট্রেডিংয়ের নামে গম, মসুর, ছোলা ও হলুদ মটর ক্রয়ের কথা উল্লেখ করে ১৮০ দিনের জন্য ২৫ কোটি টাকার টাইম লোনের আবেদন করা হয়। মিথ্যা স্টক, অভিজ্ঞতা ও গুদাম সংক্রান্ত তথ্য দেখিয়ে কোনও জামানত ছাড়াই ঋণ প্রদানের সুপারিশ করা হয়।
ইউসিবির করপোরেট ব্যাংকিং ও ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের যৌথ কমিটি ১৭টি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণসহ ঋণ প্রস্তাবটি পরিচালনা পর্ষদের কাছে উপস্থাপন করে। এসব নেতিবাচক দিক উপেক্ষা করেই ২০২০ সালের ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৪৪৮তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় ঋণটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
ঋণ বিতরণের পর অর্থের গতিপথ আড়াল করতে ২০২০ সালের ২৩ ও ২৪ মার্চ যথাক্রমে ১০ কোটি ও ১৫ কোটি টাকা প্রথমে ব্যাংকের জেনারেল লেজার হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরে পে-অর্ডারের মাধ্যমে অর্থ চারটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান আলফা ট্রেডার্স, ক্ল্যাসিক ট্রেডিং, মডেল ট্রেডিং ও ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের হিসাবে পাঠানো হয়।
দুদক জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীরা মূলত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও সহযোগী। পরে এই অর্থ আরামিট সিমেন্ট পিএলসি ও আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেডের হিসাবে স্থানান্তর করে প্রায় ১৪ কোটি ১১ লাখ টাকা পূর্ব দায় সমন্বয়ে ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া আরামিট গ্রুপের কয়েকজন কর্মচারী ৯ কোটি ৪১ লাখ ৭ হাজার ২০০ টাকা নগদ উত্তোলন করে হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।